eaibanglai
Homeএই বাংলায়মলীন চাঁদের আলো চিরে পাড়ায় আঁধার নিয়ে এল স্বর্গরথ

মলীন চাঁদের আলো চিরে পাড়ায় আঁধার নিয়ে এল স্বর্গরথ

মনোজ সিংহ, দুর্গাপুর: শোকে পাথর পশ্ সিটিসেণ্টার পাড়ায় জুম্মাবারের সন্ধ্যায় হুটার বাজিয়ে লাশকাটা ঘর থেকে পরপর তিনটি অ্যাম্বুল্যান্স বোঝাই হয়ে ফিরে এল তিনটি নিথর দেহ। শোকে পাথর নিশ্চুপ ভিড়ের নৈশব্দ ভেঙে অস্ফুটে বেরিয়ে এল চাপা হাহাকার- ‘বিধির বিধান এত নির্মমও হয়? সুখের সংসার এমন করেই কি ছারখার হতে হয়!’

গুরুবার দুপুরের সোনালী রোদ গায়ে মেখে রূপোলী স্বপ্নে বুঁদ ছোট্ট এই পরিবারের তিনটি ঝকঝকে প্রাণ নিজেদের ছয় এয়ার ব্যাগের ‘সুরক্ষিত’ দামী কালো ক্রেটা গাড়ির কাঁচ তুলে পাড়া থেকে হুস্ করে ভ্যানিস্ হয়ে গেল দমদম বিমানবন্দরের পথে। সাতাশ বছরের শাহনওয়াজকে প্লেন ধরানোর তাড়া।

“সেই তাড়াই কেড়ে নিল সব কিছু। আর এই দুঃস্বপ্ন আমাকেও তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াবে সারাটা জীবন। এ যন্ত্রনা বলে বোঝানোর নয়,” বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়। জাতীয় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত ইস্পাত কারখানার সহকর্মী শেখ মহম্মদ মুর্শেদের আশৈশব বন্ধু। তার বুকফাটা আর্তনাদ, “ওই তরতাজা ভাইপোটা কি ব্রাইট ছেলে, কি ভীষণ ভদ্র। আমি ছিলাম ঐ পরিবারেরই একজন। সব শেষ হয়ে গেল!” শেখ পরিবারের প্রতিবেশী রঞ্জন তিওয়ারির আক্ষেপ, “এবার থেকে নিউ ইয়ার এলেই আমাদের মন খারাপ হয়ে যাবে। কোনোদিনই ভুলতে পারবো না।”

হাসিখুশির ভরা সংসারের সব আলো নিভিয়ে দিয়ে ওরা যে চিরতরেই ভ্যানিস্ হয়ে আসলে স্বর্গরথের সওয়ারী হতে চললেন – তা টের পায়নি পাড়ার কেউই। তাই, স্তব্ধ মহল্লার কংক্রিটের সড়কে শববাহী শকটের ধাবমান চাকার কর্কস ঘর্ষন শোকাতুর পাড়ার বিদ্ধস্ত বাসিন্দাদের কানে বুলডোজারের উদ্ধত নৃশংসতাই মনে হয়েছে এদিন। শুক্রবারের হিমশীতল সন্ধ্যার মাগরিবের মলীন চাঁদ যখন পাড়ার মাথার ওপর, সারি সারি তিনজনের সাদা কাপড়ে মোড়া নিঃসাড় দেহ তখন শোওয়ানো হল ঠান্ডা মেঝেয়, সমাজকর্মী পরিমল অগস্তি – যিনি ঘটনার পর থেকে নিজের মত করে পরিবারের আত্মীয়স্বজনদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, অশ্রুবাস্প রুমালে মুছে ডুকরে কেঁদে উঠলেন, “ওপর ওয়ালার এমন বিচার মেনে নিতে পারিনা। এ বিচার নয়, আশি বছরের এক অসহায় বৃদ্ধা মায়ের সাথে অবিচারই হল না কি?”

হ্যাঁ। আশি বছরের শোক বিহ্বল নাসীমা বেগমকে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে তখন অনবরত সান্তনা দিচ্ছেন প্রতিবেশী আর পরিজনেরা। বৃদ্ধার সামনের চাতালে পরপর শায়িত পুত্র মুর্শেদ, পৌত্র শাহনাওয়াজ আর পুত্রবধূ রোজিনার সেলাইকরা থাক থাক লাশ। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার পৌত্র কি দাদির কষ্ট বুঝেই নির্বাক, নিঝুম!

এরা সকলেই সিটিসেণ্টারের সেল কো-অপারেটিভ এলাকার রাণী রাসমণি পথের উচ্চবিত্তদের পাড়ার স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে দমদম বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে বর্ধমানে আচমকাই ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনার শিকার তিনজন।

নতুন বছরের প্রথম দিনেই পূর্ব বর্ধমানের শক্তিগড়ে ঘটে যায় ওই মর্মান্তিক পথ দুর্ঘটনা। ওই দুর্ঘটনায় একই পরিবারের তিনজনের প্রাণহানি হয়, যা নতুন বছরের শুরুতেই এলাকায় শোকের আবহ তৈরি করে। দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই পরিবার ও আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে নেমে আসে গভীর শোক।
শুক্রবার বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ তিনজনের দেহ তিনটি অ্যাম্বুলেন্সে করে দুর্গাপুরের সিটি সেন্টারের সেল কো-অপারেটিভ এলাকার সারদামণি পথে আনা হয়। দেহ পৌঁছাতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। প্রিয়জনদের শেষবার দেখার জন্য এলাকাবাসীরাও ভিড় জমান। এই ঘটনায় গোটা এলাকা শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে।

এদের আদি বাড়ি মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর হলেও, এরা ষাট বছর ধরেই শহর দুর্গাপুরের বাসিন্দা। সাতান্ন বছরের মুর্শেদ, সাতাশ বছরের শাহনাওয়াজের জন্মও এ শহরের ইস্পাত নগরীর হাসপাতালেই।

এবার স্ত্রী, পুত্রকে চিরদিনের জন্য পাশে নিয়ে এ শহরেরই ফুলবাগান কবরস্তানে চিরঘুমে শায়িত হলেন তাপস বন্ধু মুর্শেদ।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments