মনোজ সিংহ, দুর্গাপুরঃ- শিল্পাঞ্চল দুর্গাপুরের ইস্পাত নগরীর অন্যতম বিখ্যাত বাজারের মধ্যে একটি চন্ডীদাস বাজার। অবশ্য তার একটি পোশাকি নামও আছে বিসি রায় কো-অপারেটিভ সোসাইটি। ইস্পাত নগরীর বি-জোন এলাকার সমস্ত মানুষ সহ শিল্পাঞ্চল দুর্গাপুরের দূরদূরান্তে বসবাসকারী বহু মানুষ প্রতিদিনই এই চন্ডীদাস বাজারে আসেন তাদের দৈনন্দিন বাজার করতে। চন্ডীদাস বাজারের বিশেষত্ব হলো টাটকা ফল, সবজি, মাছ সহ সুলভ মূল্যে গৃহঙ্গনের সমস্ত আসবাবপত্র পাওয়া যায় এই বাজারে। দুর্গাপুর ইস্পাত নগরী স্থাপনের সাথে সাথেই মূল রাস্তার দুধারে অবৈধভাবে গজিয়ে ওঠে একাধিক দোকান। কালান্তরে তা পরিণত হয় চন্ডীদাস খোলা বাজার নামে। কয়েক দশক আগে চন্ডীদাস বাজারের প্রায় ৮০০ জন দোকানদার একত্রিত হয়ে তৈরি করেন বিসি রায় কো-অপারেটিভ সোসাইটি। চন্ডীদাস বাজারের প্রায় সকল ব্যবসায়ী এই সোসাইটির সাথে যুক্ত হন তখন।
প্রায় তখন থেকেই শুরু হয় চন্ডীদাস খোলা বাজারের পথ চলা। যেহেতু দুর্গাপুর ইস্পাত কর্তৃপক্ষের জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে উঠেছিল এই চন্ডীদাস খোলা বাজার, তাই ডিএসপি কর্তৃপক্ষ বারংবার তাদের দোকান ঘর গুলি গুড়িয়ে দিয়ে যেতেন সময় সময়ে। কিন্তু বামফ্রন্ট আমলে চন্ডীদাস খোলা বাজারের সাধারণ ব্যবসায়ীরা গড়ে তোলেন শক্ত প্রতিরোধ। পিছু হাটতে হয় ইস্পাত কর্তৃপক্ষকে। প্রায়ই তখন থেকেই কিছু দোকানদার সন্ধ্যার সময় জেনারেটারের আলোতে আলোকিত করতেন তাদের দোকান ঘর গুলি। কিন্তু বেশিরভাগ ব্যবসায়ী দুর্গাপুর ইস্পাত কর্তৃপক্ষের বৈদ্যুতিক লাইন থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ চুরি করে দশকের পর দশক বুক ফুলিয়ে দোকানদারি করে আসেছেন।
২০১১ সালে বামফ্রন্ট সরকারের পতনের পরেই রাজ্যে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসে। তখনই দুর্গাপুর চন্ডীদাস খোলা বাজারের সমস্ত ব্যবসায়ীরা একত্রিত হয়ে দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার কাছে তাদের বাজারের জন্য বেশ কয়েক-একর জায়গা দাবি করেন। প্রথমে দুর্গাপুর ইস্পাত কর্তৃপক্ষ তাতে রাজি না হওয়ার ফলে, বেশ কয়েক বছর ঝুলে থাকে এই বাজারের স্থায়ীকরণের ব্যবস্থা। কিন্তু রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের কড়া মনোভাবের ফলে একপ্রকার বাধ্য হয়েই দুর্গাপুর ইস্পাত কর্তৃপক্ষ চন্ডীদাস খোলা বাজার সংলগ্ন একটি ময়দান সহ বেশ কয়েক একর জায়গা হস্তান্তর করেন বিসি রায় কোঅপারেটিভ সোসাইটি অর্থাৎ চন্ডীদাস বাজারের ব্যবসায়ী ও দোকানদারদেরকে।
চন্ডীদাস বাজার কমিটি তাদের জায়গা চিহ্নিত হওয়ার পরেই শুরু করেন বাজারের স্থায়ীকরণের কাজ। চুক্তিভিত্তিতে স্থানীয় এক ঠিকাদারি সংস্থাকে বরাত দেওয়া হয় চন্ডীদাস বাজারের পাকাপোক্ত দোকান তৈরি করার। সেই থেকেই শুরু হয় গোষ্ঠীদ্বন্দ, বৈষম্য ও দুর্নীতির অভিযোগ চন্ডীদাস বাজার কমিটির বিরুদ্ধে। চন্ডীদাস বাজারের একটি বড় সংখ্যক ব্যবসায়ীরা চন্ডীদাস বাজার কমিটির তৈরি করা নকশার বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। তারা বারংবার দাবি জানাতে থাকেন যেভাবে এখন রয়েছে চন্ডীদাস বাজারটি আছে ঠীক তেমন ভাবেই যেন গড়ে তোলা হয় চন্ডীদাস বাজারটিকে পাকাপোক্ত ভাবে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। বছর সাতেক আগে রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী, স্থানীয় কাউন্সিলর ও সমাজসেবীদের যৌথ উদ্যোগে আবার শুরু হয় চন্ডীদাস বাজারকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার কাজ। কিন্তু বিগত বেশ কয়েক দশক ধরে বাজার পরিচালন সমিতির নির্বাচন না হওয়ার ফলে একপ্রকার আবার বিলম্ব শুরু হয় দোকানঘর তৈরির কাজ। একশ্রেণীর ব্যবসায়ীদের অভিযোগ যে ঠিকাদারি সংস্থাকে নতুন দোকান ঘর তৈরি করার বরাত দেওয়া হয়েছিল তিনি নাকি বহু টাকা দুর্নীতি করেছেন। তাই তারা দাবি করেন যতক্ষণ না সেই সব দুর্নীতির ও টাকা নয়-ছয়ের হিসাব হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত বন্ধ থাকুক নতুন দোকান ঘর তৈরি করার কাজ।
এদিকে জন্ম লগ্ন থেকে বিদ্যুৎবিহীন চন্ডীদাস বাজার কিন্তু দুর্গাপুর ইস্পাত কর্তৃপক্ষের চুরির বিদ্যুতে আলোকিত ছিল। তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীদের বারংবার অনুরোধের পর প্রায় ৫০০ জন ব্যবসায়ী দশজনের একটি কমিটি তৈরি করে চন্ডীদাস খোলা বাজারে রাজ্য সরকারের বিদ্যুৎ নিগমের কাছ থেকে বৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়ার কাজে মনোননিবেশ করেন বলে জানা যায়। আজ দুপুরে চন্ডীদাস খোলা বাজারের সবজি পট্টি এলাকায় চন্ডীদাস বাজারের ব্যবসায়ীরা একত্রিত হয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলন করে জানান, “কয়েক বছর আগে যখন চন্ডীদাস বাজার পরিচালন সমিতির কোন কার্যকরী ক্ষমতা ছিল না তখন সকল চন্ডীদাস বাজারের ব্যবসায়ীরা একত্রিত হয়ে বৈধ বিদ্যুতের ব্যবস্থার জন্য প্রায় ৭০ লক্ষ টাকা দশজনের একটি কমিটি করে প্রায় ৫০০ জন দোকানদারের কাছ থেকে আদায় করেছিলেন নতুন ভাবে বৈধ-বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়ার উদ্দেশ্যে। তখন নাকি ওই দশজনের কমিটি স্থির করে যে সকল ব্যবসায়ীরা প্রায় ১৫ হাজার টাকা করে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়ার জন্য টাকা দিয়েছেন তারা রাজ্য বিদ্যুৎ নিগমের ট্রান্সফরমার যখনই বসবে তখনই তারা বিদ্যুৎ সংযোগ পাবেন নির্দ্বিধায়। কিন্তু তার প্রায় এক বছর পরে রাজ্য সরকারের আদেশ অনুসারে বিসি রায় কোঅপারেটিভ সোসাইটির পরিচালন সমিতির নির্বাচন হয়। যদিও এদিন স্থানীয় ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশই অভিযোগ করেন তাদেরকে ওই নির্বাচনে মনোনয়ন জমা দিতে বাধা দিয়েছিলেন এখনকার পরিচালন সমিতির কর্মকর্তারা।”
চন্ডীদাস খোলা বাজারের বেশিরভাগ ব্যবসায়ী এদিন অভিযোগ করেন “তারা বহুদিন আগে ১৫ হাজার টাকা করে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়ার জন্য দিয়েছিলেন। কিন্তু নতুন পরিচালন সমিতি সেই টাকা অন্য খাতে কেটে নিচ্ছে এবং তাদের কাছ থেকে আরও প্রায় ২৫ হাজার টাকা করে নাকি দাবি করছেন।” এদিন উপস্থিত সকল বিক্ষুব্ধ চন্ডীদাস বাজারের ব্যবসায়ীরা আন্দোলন সংগঠিত করে জানান, “যতক্ষণ না যারা আগে টাকা দিয়েছেন তারা নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ পাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত চন্ডীদাস বাজারের নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার কাজে তারা বাধা দেবেন।”
এদিন বিক্ষুব্ধ চন্ডীদাস বাজারের ব্যবসায়ীরা মিছিল সংগঠিত করে পুরো চন্ডীদাস বাজারে স্লোগান দিতে থাকেন, ‘বাজার কমিটির দুর্নীতি মানছি না মানবো না’, ‘টাকা দিয়েছি বিদ্যুৎ চাই’, ‘বাজার কমিটিতে ঘুঘুর বাসা ভাঙতে হবে’, ‘সকল দোকানদারদের সমান অধিকার দিতে হবে’, এই জাতীয় একাধিক শ্লোগানে মুখরিত হয় চন্ডীদাস বাজার এলাকা এদিন দুপুরে।
এখন প্রশ্ন হল কেনই বা একটি বিশাল সংখ্যক চন্ডীদাস বাজারের ব্যবসায়ীরা এ হেনো প্রতিবাদ জানাচ্ছেন তাদের নিজেদেরই বাজার পরিচালন সমিতির বিরুদ্ধে? কেনই বা চন্ডীদাস বাজার পরিচালন সমিতি সাধারণ দোকানদারদের কষ্ট অর্জিত ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে তাদেরকে বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে বঞ্চিত করছে? কার অঙ্গুলি হিলনে চলছে এই অরাজকতা চন্ডীদাস বাজার পরিচালন সমিতিতে? এইরকম হাজারো প্রশ্ন এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে শিল্পাঞ্চলের বাসিন্দাদের মুখে মুখে। তবে একটা কথা নিশ্চিত করে বলা যায় ‘চুরির বিদ্যুৎ সংযোগে ছিল মধুচন্দ্রিমা আর বৈধ-বিদ্যুৎ সংযোগে হল বৈষম্য, দলাদলি ও আমরা ওরা’?
সাধারণ শিল্পাঞ্চলের বাসিন্দারা চন্ডীদাস বাজারকে একটি স্থায়ী বাজারের রূপ দেওয়াকে কেন্দ্র করে খুবই আশাবাদী। আগামী দিনে নিশ্চয়ই চন্ডীদাস বাজার পরিচালন সমিতি ও বিক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমঝোতা হবে এবং আবার চন্ডীদাস খোলা বাজার তাদের পুরনো জৌলুষ ফিরে পাবে এই আশা করেন।





















