মনোজ সিংহ, দুর্গাপুরঃ- মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ভারতীয় জনতা পার্টির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীনকে বরণ করা হলো দুর্গাপুরের রাজীব গান্ধী স্মারক ময়দানে কমল মেলায়। সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলায় এটাই তাঁর প্রথম কর্মসূচি। প্রসঙ্গত গত কয়েকদিন আগেই বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি পদে বসেছেন নবীন। এদিন আতশবাজির মাধ্যমে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতিকে স্বাগত জানান দলীয় নেতা কর্মীরা।
এদিনের অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, বিহারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মঙ্গল পান্ডে, রাজ্য ইনচার্জ সুনীল বনশল, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী ডাঃ সুকান্ত মজুমদার, সাংসদ নিশীথ প্রামাণিক, সাংসদ সৌমিত্র খান, বিরোধীদল নেতা শুভেন্দু অধিকারী, প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ, জ্যোতির্ময় মাহাতো,পার্শ্ববর্তী চারটি জেলার বিধায়ক সহ স্থানীয় বিজেপি নেতারা।
এই কমল মেলার মুখ্য প্রবেশ দ্বার অলংকৃত করা হয়েছে বীরাঙ্গনা বঙ্গনারীদের তৈলচিত্রে ও এছাড়াও মেলায় বঙ্গভূমির মহাপুরুষদের একাধিক তৈলচিত্র প্রদর্শিত হয়েছে। সেখানে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ক্ষুদিরাম বসু, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী, সত্যজিৎ রায়, কিশোর কুমার, উত্তম কুমার সহ বঙ্গভূমির একাধিক বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের ছবি রয়েছে। কিন্তু পশ্চিম বর্ধমান জেলার ভূমিপুত্র বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কোন ছবি নেই সেখানে। কেন এই বৈষম্য প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। তবে একটা কথা না বললেই নয়, ভারতীয় জনতা পার্টির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন কিন্তু তার উদ্বোধনী ভাষণে মঞ্চ থেকে স্পষ্ট করে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের নাম স্মরণ করেছেন শ্রদ্ধার সাথে অন্যান্য বাংলার মনীষীদের নামের সাথে।
শিল্পাঞ্চল দুর্গাপুরের একাধিক বাসিন্দা এদিন মেলা প্রাঙ্গণে বঙ্গভূমির বিখ্যাত সব মনীষীদের ছবির মাঝে পশ্চিম বর্ধমান জেলার ভূমিপুত্র বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ছবি না থাকাই অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নাম প্রকাশে অনচ্ছুক শিল্পাঞ্চলের এক সাধারন বাসিন্দা বলেন, “বিজেপির টাকা আছে কিন্তু বাংলার সংস্কৃতি, সাহিত্য, শিক্ষা এবং শিল্পের মানচিত্রের রূপরেখা কোন কিছুই তাদের জানা নেই। পশ্চিম বর্ধমান জেলার বুকে কমল মেলা নাম করে এত বড় মেলার আয়োজন হল, বাঙ্গালীদের মন জয় করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু এই পশ্চিম বর্ধমান জেলার বিশ্বব্যাপী বিখ্যাত একমাত্র ভূমিপুত্র বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কোন ছবি স্থান পায়নি মেলায়। তিনি মুসলিম বলে কি তাঁর ছবি এই মেলায় কোন জায়গা পেল না ? এই একটি ঘটনা থেকেই পরিষ্কার বিজেপি শুধুমাত্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করছে।”
শিল্পাঞ্চল দুর্গাপুরের একাধিক বাসিন্দা কমল মেলায় বেড়াতে এসে জানান,”শীতের বিকেলে বিখ্যাত টলিউড-বলিউডের সংগীত শিল্পীদের বিনা পয়সায় অনুষ্ঠান দেখতে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। যদিও তারা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন কমল মেলা ভারতীয় জনতা পার্টির নির্বাচনী প্রচারের একটি অঙ্গ। পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে এই ধরনের মেলার আয়োজন করা হয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন।”
শিল্পাঞ্চল দুর্গাপুরের বেশ কিছু সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী এদিন কমল মেলা ঘুরে দেখে জানান, “এই মেলার আয়োজনটি যদি সম্পূর্ণভাবে কোন বাঙালি গোষ্ঠীর দায়িত্বে দেওয়া হত তাহলে মনে হয় ভারতীয় জনতা পার্টি বাংলার মানুষকে যা বলতে চাইছেন তা আরো ভালোভাবে বোঝানো যেত সহজ করে ও সঠিকভাবে। পুরো মেলাটির পরিচালনায় অবাঙালিয়ানার ছাপ স্পষ্ট রয়েছে। বঙ্গ বিজেপির নেতাদের উচিত বাংলা ভাষায় উচ্চশিক্ষিত দক্ষ দলীয় কর্মীদের নিযুক্ত করে এ ধরনের মেলার পরিচালনা ও রূপরেখার দায়িত্ব দেওয়া। কারণ বাংলা ও বাঙালির মন বুঝতে আগে মনে প্রাণে বাঙালি হতে হবে ভারতীয় জনতা পার্টিকে।”
এদিন কমল মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল বলিউডের জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী মোনালী ঠাকুরের গানের অনুষ্ঠান। তার সুরেলা গানের মুর্ছনায় মেতে ওঠেন শ্রোতারা।
অন্যদিকে মেলার উদ্যোক্তা দুর্গাপুর নাগরিক মঞ্চ হলেও ব্যানারে নাম নেই সংগঠনের। এদিকে মেলার সঙ্গে বিজেপির সর্বভারতীয়,কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নেতৃত্বের যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। তাদের মতে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উপস্থিতি থেকেই স্পষ্ট যে মেলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
এই মেলা নিয়ে রাজ্যের মন্ত্রী তথা দুর্গাপুরের বিধায়ক প্রদীপ মজুমদার কটাক্ষেক সুরে বলেন, “বাংলার সংস্কৃতি ফেরাতে হলে আগে বাংলাকে ভাল করে জানতে হয়। নাম ও পরিচয়ের বিকৃতি করে সংস্কৃতি রক্ষার দাবি বিশ্বাসযোগ্য নয়।”


















