মনোজ সিংহ, দুর্গাপুর:- গত ১৩ই ফেব্রুয়ারি শুক্রবার জুম্মার নামাজের পরই, দুর্গাপুরের রাধা চক্রবর্তী বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হয়ে সানভি মল্লিক হলেন। প্রায় এক দশকেরও বেশি হিন্দু সনাতনী বাড়ির মেয়ে রাধা প্রেমের বন্ধনে ভিনজাতির মুসলিম সাথী জয়নুল (বাবু) মল্লিক এর সাথে আবদ্ধ থাকার পর, বিবাহ বন্ধনে নতুন করে জীবনের পথ চলা শুরু করলেন শুক্রবার। সবজান্তা google বলছে আরবি ভাষায় নাকি ‘সানভি’ র অর্থ ‘সুন্দর’। আর হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বলছে ‘সানভি’র অর্থ ‘দেবী লক্ষ্মী’। সত্যিই কি অদ্ভুত মিলন এই দুটি নামে। রাধা যেমন নিজের নিঃস্বার্থ প্রেমে শ্রীকৃষ্ণের নামের আগে জায়গা করে নিয়েছেন, ঠিক তেমনি দুর্গাপুরের রাধা ও নিজের নিঃস্বার্থ প্রেমে সানভি হলেন।
স্বর্গীয় উৎপল চক্রবর্তী ও পুতুল চক্রবর্তীর একমাত্র কন্যা রাধা অল্পবয়সেই পিতৃহারা হয়েছিলেন। অভিভাবকহীন পরিবারের দৈনন্দিন কষ্টের মধ্যেও তিনি নিজেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে সক্ষম হয়েছেন। নিজের অক্লান্ত পরিশ্রম, সংকল্প ও অধ্যাবসায়ের ওপর ভিত করে আজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন সমাজের বুকে মাথা উঁচু করে। জীবনের কঠিন লড়াই এর মুহূর্ত গুলির সম্মুখীন হতে পিছ পা হননি তিনি কখনো। তার এই কঠোর পরিশ্রমে ভরা জীবন যুদ্ধে নির্ভরশীল সাথী হিসেবে পেয়েছিলেন দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের বিধাননগরের সন্নিকটে কালিগঞ্জ গ্রামের যুবক জয়নুল মল্লিক কে, যাকে এলাকায় বাবু মল্লিক হিসেবেই সবাই জানেন।

সময়ের সাথে সাথে জাতি-বর্ণ-ধর্ম সব কিছুকে পিছনে ফেলে একে অপরের বিশ্বস্ত বন্ধু হয়ে নিজ উদ্যোগে শুরু করেছেন বেশ কয়েকটি সমাজসেবা মূলক কর্মকাণ্ড। তাদের এই দীর্ঘদিনের পথ চলায় কখনো ধর্ম বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। মানুষের পরম ধর্ম যে প্রেম তা আরেকবার প্রমাণিত হয়েছে। বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের কথায় ও কবিতায় “একই বৃন্তে দুইটি কুসুম হিন্দু মুসলমান” শব্দগুলি যেন আজ আবার সত্য বলে প্রমাণিত হলো। আজ বিশ্বজুড়ে যখন জাতি-ধর্ম ও বর্ণ নিয়ে এক বিদ্বেষের বিষ ছড়িয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময় এইরকম রাধার নিষ্পাপ প্রেমী অমৃত ধারাতে সমাজের বিদ্বেষের কালিমা ঘোচাতে সাহায্য করছে।
দুর্গাপুরের এই ব্যতিক্রমী যুগল বিধাননগরের সন্নিকটে কালীগঞ্জে ‘নিউ আর্ট সোসাইটি দুর্গাপুর’ নামক সামাজিক সংগঠন গড়ে তুলেছে। পেশায় সাংবাদিক বাবু মল্লিক নিজের সারাদিনের কর্মব্যস্ততার মধ্যেও রাধার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেদেরকে ব্যস্ত রেখে সমাজের অবহেলিত, নিপীড়িত ও দুঃখী মানুষদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদেরকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

তাদের ‘নিউ আর্ট সোসাইটি দুর্গাপুর’ নামক সামাজিক সংগঠনটি সারা বছর জুড়ে বিভিন্ন সামাজিক কাজকর্ম যেমন রক্তদান শিবির, বস্ত্রদান শিবির, দুস্থদের কম্বল বিতরণ, অংকন প্রতিযোগিতা ও শারদ উৎসবের আগে আদিবাসী এলাকার ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের বস্ত্রবিতরণ সহ একাধিক কাজ কর্মের মধ্যে জড়িয়ে থাকেন এই ব্যতিক্রমী যুগল জুড়ি। বহু কচিকাঁচা নিজেদের আগামী জীবনের জন্য সঠিক পাঠ্যক্রম, খেলাধুলা, শিল্পকর্ম ও অঙ্কনে নিজেদেরকে পারদর্শী করছেন এই সামাজিক সংগঠনটি থেকে।
শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন গুণীজনেরা এই ব্যতিক্রমী যুগল জুড়ির কাজকর্মের ভুসি প্রশংসা ও সাধুবাদ জানিয়েছেন। গত ১৩ই ফেব্রুয়ারি শুক্রবার সন্ধ্যায় তাদের বিবাহ বন্ধনের আবদ্ধ হওয়ার উপলক্ষে একটি ছোট্ট অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে দুর্গাপুরের বহু নাম-দামি ব্যক্তি, গুণীজন, বুদ্ধিজীবী, সমাজসেবী, পুলিশ কর্মী, রাজনৈতিক নেতা সহ একাধিক ব্যক্তি ওই ব্যতিক্রমী যুগল জুড়ি কে আশীর্বাদ করতে এসেছিলেন তাদের বিবাহ বাসরে।
‘চ্যানেল এই বাংলায়’ এর সকল কর্মীবৃন্দ, বন্ধু ও অনুরাগীদের তরফ থেকে রইল এই ব্যতিক্রমী যুগল জুড়ি রাধা-বাবুর আগামী জীবনের জন্য শুভকামনা ও ভালোবাসা।



















