নিজস্ব সংবাদদাতা,দুর্গাপুরঃ- এই ডিজিটাল যুগের আগে যখন যোগাযোগ মাধ্যমে এভাবে বিপ্লব আসেনি, তখন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল চিঠি। প্রচীন কাল থেকেই মানুষ তাঁর আবেগ ও ভাব প্রকাশের জন্য লেখাকে হাতিয়ার করেছে। কখনও তা লেখা হতো পাথরে খোদাই করে কখনও বা পাতায়, প্রাকৃতিক নানা রঙ কালি ব্য়বহার করে। পাতায় লেখাই বহুল প্রচলিত ছিল বলে তাকে বলা হতো পত্র। এই পত্রই পরবর্বীতে চিঠি রূপে মানুষের আবেগ আদান প্রদান, কুশল বিনিময়ের অন্যতম মাধ্যম হয়ে ওঠে। আর এই চিঠি আদান প্রদানের জন্য গড়ে ওঠে ডাক ব্যবস্থা। কিন্তু বর্তমান সময়ের ডিজিটাল যুগে বিলুপ্তির পথে হাতে লেখা চিঠি। খামে ভরা এক টুকরো কাগজে, পোস্ট কার্ডে বা ইনল্যান্ডে, লেখা প্রিয় জনের বার্তা যখন হাতে এসে পৌঁছতো, সেই রোমাঞ্চ, সেই আনন্দ অনুভুতি আজ হারিয়ে গেছে। ডিজিটাল যুগে হাতে লেখা চিঠি ও তার সেই আবেগ হয়তো আর ফেরানো সম্ভব নয়। তবে হাতে লেখা চিঠিকে নতুনভাবে জনমানসে পৌঁছে দিতে উদ্যোগ নিয়েছে ভারতীয় ডাক বিভাগ। সম্প্রতি তাঁরা দেশ জুড়ে প্রতিটি সার্কেলে ‘ঢাই অক্ষর’ শীর্ষক চিঠি লেখার প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল। আর এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সার্কেলে প্রথম স্থানটি অধিকার করেছে দুর্গাপুরের ছোট্ট ছেলে স্বপ্নীল।
দুর্গাপুরের ডিএভি মডেল স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র স্বপ্নীল মুখোপাধ্যায়, ইস্পাত নগরীর তিলক রোডের বাসিন্দা। বাবা সৌমেন মুখোপাধ্যায় ডিএসপি কর্মী। মা শ্রাবণী মুখোপাধ্যায় গৃহবধূ। স্বপ্নীল ভারতীয় ডাক বিভাগের ‘ঢাই অক্ষর’ প্রতিযোগিতার অনূর্ধ্ব ১৮ বছরের ইনল্যান্ড লেটার বিভাগে অংশ নিয়েছিল। যেখানে ‘দ্য জয় অফ লেটার রাইটিং’ বিষয়ে লিখে বাজিমাত করে এবং জিতে নেয় ২৫ হাজার টাকা নগদ পুরস্কার।
স্বপ্নীল জানায়, একেবারে প্রথম শ্রেণি থেকেই ডায়েরি লেখার অভ্যাস তার। পরে মামা মামী ও স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের উৎসাহে প্রাত্যহিক নানা বিষয়ে লেখা লেখি শুরু করে। শুধু লেখা লেখি নয়, গল্প উপন্যাস পড়তেও ভালোবাসে ডিএভি মডেলের অষ্টম শ্রেণির এই ছাত্র। স্বপ্নীল একদিকে যেমন বাংলায় শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্য পড়তে ভালোবাসে অন্যদিকে তেমনি জে কে রাউলিং-এর লেখাও ভালোবাসে। এই সময়ের কিশোর কিশোরীদের মধ্যে যখন মোবাইল, রিলস, ভিডিও গেম নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকাই ট্রেন্ডস তখন দুর্গাপুরের এই প্রতিভাময় পড়ুয়াটি কিন্তু এক্কেবারে অন্য ধারার। তবে স্বপ্নীল শুধু সাহিত্য প্রেমী নয়, সে কবিতা আবৃত্তি করে, ধোলাধূলা করে, ছবি আঁকে, আইপিএল-এর ম্যাচও দেখতে ভালোবাসে।
পারিবারিক আবহ ছাড়া জীবনের এই অন্য ধারায় বয়ে যাওয়া সহজ নয়। বিশেষ করে আজকের সময়ে বর্তমান প্রজন্মের উপর অভিভাবকদের প্রত্যাশার চাপ যখন বহুল সমালোচিত বিষয়। স্বপ্নীলের মা শ্রাবণী জানালেন, “ওর মধ্যে সহজাতভাবেই হয়তো লেখা লেখি করার প্রবণতা রয়েছে। ওর প্রতি আলাদা করে কোনো প্রত্যাশা নেই। ভবিষ্যতে ও যদি আর্টস নিয়ে পড়াশুনা করতে চায়, লেখা লেখি নিয়ে এগিয়ে যায়, যাবে। আমরা ওকে সহযোগিতা করে যাব।”
স্বপ্নীল অবশ্য জানিয়েছে ওর প্রিয় বিষয় ইতিহাস। আর ভবিষ্য়তে পাঁচজনের মতো ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার নয় বরং জীবাশ্মবিদ্যা নিয়ে পড়াশুনা, গবেষণা ও কাজ করার ইচ্ছা। এমনকি পুরস্কারের নগদ অর্থও সে তার এই ভবিষ্য়ৎ পড়াশুনার জন্য বাঁচিয়ে রাখতে চায়।
ডাক বিভাগের প্রতিযোগিতায় রাজ্যের মধ্যে প্রথম হয়ে শহর দুর্গাপুরের নাম উজ্জ্বল করেছে স্বপ্নীল। আগামী দিনে সে তার কাজ দিয়েও এই শহরের নাম বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার স্বপ্ন পূরণ করুক।





