মনোজ সিংহ, দুর্গাপুরঃ– বন্ধু সেজে লুঠ আর চোর ডাকাতের লুঠের মধ্যে ফারাক তো আছেই, যা আরও স্পষ্ট হল এক দরদী হাসপাতালের ভালোবাসার ছলনায়।
স্বামী বিবেকানন্দের নামের আড়ালে স্বাস্থ্য বাণিজ্যের ফাঁদ পাতা এক হাসপাতালের কাজ কারবারে রবিবার থেকে বুক কাঁপছে ইস্পাত নগরীর বয়ো:বৃদ্ধ বাসিন্দাদের। তাদের দৃঢ় আশঙ্কা ঐ হাসপাতালের স্বাস্থ্য কার্নিভালের চৌকাঠ ডিঙ্গালেই , যে এবার কৌশলে তাদের মেডিক্লেমের সবটুকু চেটেপুটে সাফ করতে পাড়ার মাঠে তাঁবু খাটিয়ে সাধুর বেশে বসে পড়তে চলেছে বর্গী হানাদার!
আর এই হানাদারদের পথ দেখিয়ে পাড়ার মোড়ে আদর করে ডেকে আনল কে ? কে যার পেটের খিদে মেটায় ওপরতলা থেকে নিচুতলা, বছরের পর বছর ?
কথায় আছে, বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। আর শিল্পাঞ্চলে শারদ উৎসবের পর থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে লাগাতার পুজো, উৎসব, কার্নিভাল, নবজাগরণের বাণিজ্য মেলার হিড়িক। সবেতেই কোথাও মাথা, কোথাও লেজ গুঁজে সরদারিতে মত্ত থাকেন একশ্রেণীর চটপটি মাস্টারের দল।
এতেও তাদের ঠিক পোষাচ্ছিল না। তাই, এবার নতুন করে শুরু হল হেলথ কার্নিভাল। যদিও শহরেরই ‘আরাধনা ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’ নামক একটি সংস্থা বেশ কয়েক বছর ধরে শিল্পাঞ্চল দুর্গাপুর ও আশেপাশের এলাকায় বড় বড় হেলথ ক্যাম্প অনুষ্ঠিত করে আসছে শীতকালে, কিন্তু তারপরও গত শনিবারের সন্ধ্যায় এক সাংবাদিক সম্মেলন করে দুর্গাপুরের বিধাননগর স্থিত বিবেকানন্দ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায় ১০ জানুয়ারি থেকে ইস্পাত নগরীর বি-জোন কাশীরাম ময়দানে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে তিন দিনের একটি আলাদা হেলথ কার্নিভাল।
ভালকথা। কিন্ত, হঠাৎ খোদ ইস্পাত নগরীর পেটের ভেতর ঢুকে এই কার্নিভালের কিসের এত দরকার পড়ল? বিশেষ করে যার ঢিল ছোঁড়া দুরত্বে রয়েছে স্বাস্থ্য পরিষেবার অতন্দ্র প্রহরী ইস্পাত কারখানার মেইন হাসপাতাল? সাংবাদিক সম্মেলনে এক প্রশ্নের উত্তরে জানা গেল, শহরের বিবেকানন্দ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিনামূল্যে স্বাস্থ্য ও হেলথ চেকআপ ক্যাম্পের ব্যবস্থা রাখছে এই কার্নিভালে। যেখানে ঐ হাসপাতালের বেশ কয়েকজন নামিদামি ডাক্তারও উপস্থিত থাকছেন। বুড়ো রোগীদের মনোরঞ্জনের জন্য দুদিন ধরে কলকাতার চলচ্চিত্র শিল্পী তথা নামকরা ব্যান্ডের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হবে ওই প্রাঙ্গণেই।
দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের ইস্পাত নগরীর মধ্যস্থলে কেন এই হেলথ কার্নিভালের আয়োজন? প্রশ্ন করা হলে বিবেকানন্দ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায় – “এলাকার বয়স্ক মানুষদেরকে তাদের দোরগোড়াতে স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দিতে চান তারা। তাই এই কার্নিভালের আয়োজন।”
কিন্তু, ইস্পাত নগরীতেই কেন? কোনো দূর-দূরান্ত গ্রামীণ এলাকায় এই কার্নিভালের আয়োজন করা হলো না কেন – এ প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। শিল্পাঞ্চলের একশ্রেণীর বাসিন্দাদের অভিযোগ দুর্গাপুর ইস্পাত নগরীতে বসবাসকারী বেশিরভাগ মানুষই দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানা বা দুর্গাপুর মিশ্র ইস্পাত কারখানার প্রাক্তন কর্মী। তাদের প্রায় প্রত্যেকেরই রয়েছে স্টিল অথরিটি অফ ইন্ডিয়া লিমিটেডের দেওয়া মেডিক্লেম। তার কভারেজে থাকা অসুস্থ মানুষকে মেইন হসপিটাল বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগীদেরকে উচ্চতর চিকিৎসার জন্য স্থানান্তরিত করে দুর্গাপুরের বেশ কয়েকটি বেসরকারী হাসপাতালে। কিন্তু, বিবেকানন্দ হাসপাতাল সেক্ষেত্রে নিতান্তই কম সংখ্যক রোগী পেয়ে থাকে বলে একটি সূত্র মারফত জানা যায়। ইস্পাত নগরী থেকে তাই হয়তো তারা এবার সমস্ত রোগীদের জন্য নিজেদের হাসপাতালের প্রোমোশন করার লক্ষ্যে ও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মেডিক্লেম আছে, এমন ব্যক্তিদেরকে টার্গেট করেই অনুষ্ঠিত করতে চলেছে এই হেলথ কার্নিভাল, ইস্পাত নগরীর কাশীরাম দাস ময়দানে। যার নেপথ্যে কি আসলে ভাগাড়ের ওপর শকুনের দৃষ্টি।
অবাক করার বিষয় হলো – দুর্গাপুর ইস্পাত নগরী ‘বি-জোন ক্লাব সমন্বয়’ নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যারা বিগত দিনে দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিলেন। বিগত কয়েক বছরে যারা নিঃস্বার্থ ভাবে ইস্পাত নগরীর মানুষের দৈনন্দিন জীবনে লাগাতার আন্তরিকতার সাথে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেই সংস্থাও নাকি এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু কেন- প্রশ্ন তুলেছেন ইস্পাত নগরীর বাসিন্দারা।
শিল্পাঞ্চলের একশ্রেণীর বাসিন্দাদের অভিযোগ বিবেকানন্দ হাসপাতাল তাদের হাসপাতালে রোগী টানার লক্ষ্যেই দুর্গাপুরের নামকরা এই সমাজসেবী ও মানব দরদী ক্লাব সমন্বয়ের সদস্যদের ব্যবহার করছে। ঐ হাসপাতালের বিরুদ্ধে শহরেরই নিউ টাউনশিপ থানায় বেশ কয়েকবার গুরুতর অভিযোগ হয়েছে। হাসপাতাল ভাঙচুরও হয়েছে। অভিযোগ হয়েছে হাসপাতালের গাফিলতিতে রোগী মৃত্যুর কারণে বেশ কয়েকবার। সেই হাসপাতাল এবার নিজেরাই রাস্তায় দাঁড়িয়ে রোগী ধরার কল পেতেছেন বলে অভিযোগ শিল্পাঞ্চলের একশ্রেণীর বাসিন্দাদের। আরো অভিযোগ এই হেলথ কার্নিভাল এর আড়ালে আসলে বিবেকানন্দ হাসপাতাল তাদের ব্যবসায়িক নখ দাঁত দিয়ে মেডিক্লেমের আওতায় থাকা রোগীদেরকে নিজেদের হাসপাতালে টানার জন্যই এই হেলথ কার্নিভালটি অনুষ্ঠিত করছেন।




















