মনোজ সিংহ, দুর্গাপুরঃ- গতকাল ছিল রামনবমী, ভগবান শ্রী রামচন্দ্র আজকের দিনেই পৃথিবীতে মনুষ্য রূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের বিশ্বাস। তাই এই দিনে সমস্ত হিন্দু ধর্মালম্বী মানুষজন ভগবান শ্রী রামচন্দ্রের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করে থাকেন। শিল্পাঞ্চল দুর্গাপুরেও ভগবান শ্রীরাম চন্দ্রের জন্মজয়ন্তী পূর্ণ ধার্মিক মর্যাদা সাথে উদযাপন করা হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচনের প্রাক্কালে রামনবমীর এই পবিত্র দিনটি শিল্পাঞ্চলের বুকে এক স্মরণীয় দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইল।
এদিন দুপুরে রাজ্যের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী তথা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল লাগোয়া লাউদোহা ফুটবল ময়দানে পাণ্ডবেশ্বরের বিধায়ক তথা নির্বাচনের প্রার্থী নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সমর্থনে এক জনসভায় অংশগ্রহণ করেন। ওই নির্বাচনী জনসভা থেকে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসকে পাণ্ডব ও বিজেপিকে কৌরবের সঙ্গে তুলনা করে দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গের এই বিধানসভার নির্বাচন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অন্যতম ইতিহাস গড়বে। পাশপাশি তিনি এদিন কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে তীব্র ভাষাই আক্রমণ করে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষকে একজোট হয়ে বিজেপির অপশাসন ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আহ্বান জানান।
অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রীর জনসভার মাত্র কয়েক ঘন্টা পরেই দুর্গাপুর ইস্পাত নগরীর বেনাচিতি বাজারের পাঁচ মাথা মোড় থেকে একটি ধর্মীয় সমাজসেবী সংগঠনের উদ্যোগে শুরু হয় রামনবমী উপলক্ষে এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। ওই বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার প্রথম সারিতেই লক্ষ্য করা যায় উন্মুক্ত তলোয়ারি হাতে দুর্গাপুর পশ্চিম কেন্দ্রের বিধায়ক তথা বিজেপির প্রার্থী লক্ষণ ঘোড়ুইকে ও লাঠি হাতে দুর্গাপুর পূর্বের কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী চন্দ্রশেখর ব্যানার্জিকে। কয়েক হাজার মানুষের এই শোভাযাত্রা বেনাচিতি বাজারের ভেতর দিয়ে ভিরিঙ্গি মোড়ে গিয়ে শেষ হয়।
কিন্তু এই শোভা যাত্রার মাঝেই হঠাৎ ঘটে যায় এক আশ্চর্য ঘটনা। রামনবমীর ওই শোভাযাত্রা যখন বেনাচিতি বাজারের প্রায় মধ্যস্থলে ঠিক তখনই দুর্গাপুর পশ্চিম কেন্দ্রের তৃণমূল কংগ্রেস মনোনীত প্রার্থী কবি দত্ত হঠাৎই হাজির হন ও সকলকে হতবাক করে মুখভরা হাসি ও উষ্ণ অভিনন্দনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী লক্ষণ ঘোড়ুইয়ের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। পাশাপাশি ভারতীয় জনতা পার্টির অন্যতম যুব নেতা পারিজাত গাঙ্গুলিকেও ভাতৃস্নেহে জড়িয়ে ধরেন ও কুশল বিনিময় করেন। তখন বিজেপি কর্মী সমর্থকদের ‘জয় শ্রীরাম’ জয়ধ্বনি চারিদিক মুখরিত হয়ে ওঠে। এরপরে শোভাযাত্রায় বেশ কিছুক্ষণ সকলের সঙ্গে পাও মেলান কবিবাবু। পরে সাংবাদিকদের তিনি জানান, ভাতৃসম ও বন্ধু লক্ষণ ঘোড়ুইয়ের সাথে শুধুমাত্র সৌজন্য সাক্ষাৎকারের জন্যই তিনি শোভাযাত্রায় অংশ নেন। সৌজন্যের রাজনীতিই দুর্গাপুরের কৃষ্টি-সংস্কৃতি। যদিও বিজেপি নেতা লক্ষণ ঘোড়ুই কটাক্ষ করে বলেন, তৃণমূল প্রার্থী কবিবাবু চাপে পড়ে রামনবমীর শোভাযাত্রায় এসেছেন।
সাম্প্রতিককালে দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে এইরকম রাজনৈতিক সৌজন্যের নজির ঘটেছে বলে ওয়াকিবহাল মহল মনে করতে পারছেন না। এদিকে শিল্পাঞ্চলের রাজনৈতিক মহলে এখন জোর গুঞ্জন চলছে কবি দত্তের রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি নিয়ে। কারণ কয়েক দিন ধরেই বিজেপির সাংসদ সৌমিত্র খাঁ ও বিজেপি প্রার্থী লক্ষণ ঘোড়ুই তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও বিভিন্ন দুর্নীতি বিষয়ে প্রকাশ্য সাংবাদিক সম্মেলনে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন। কিন্তু একজন পাকা মাথার রাজনৈতিক নেতার মত কবি দত্ত হাসিমুখে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অবশেষে রামনবমীর মিছিলে হাজির হয়ে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত কুরুচিকর ও দুর্নীতির অভিযোগকে ধুয়ে মুছে সাফ করে দিলেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। যদিও কবি দত্ত নিজে দাবি করেছেন, তিনি রাজনীতিতে সবে পা রেখেছেন, নবাগত। কিন্তু নবীনের এই রাজনীতিক চালে বিরোধী পক্ষ যে ধরাশায়ী, তা বলাই বাহুল্য। ফলে নতুন এই রাজনীতিবিদকে রীতিমতো পোড় খাওয়া রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তুলনা করছেন শিল্পাঞ্চলের অনেকেই। তাঁদের মতে এদিনের পর থেকে প্রতিপক্ষ লক্ষণ ঘোড়ুইয়ের থেকে নির্বাচনে জয় লাভের পথে আরো দু পা এগিয়ে থাকলেন কবিবাবু। দেখুন সেই সৌজন্য সাক্ষাতের ভিডিও..
এদিকে শিল্পাঞ্চলের ভারতীয় জনতা পার্টির কর্মী সমর্থকদের একাংশ এই ঘটনার পরে মর্মাহত। তাঁরা মনে করছেন এই ঘটনার পর দুর্গাপুর পশ্চিম কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থীর জয় এখন অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। কারণ কবি দত্তর বিরুদ্ধে বিজেপির সকল কর্মী সমর্থকরা যেভাবে কোমর বেঁধে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতি, স্বজন পোষণ ও জালিয়াতির অভিযোগ করেছিলেন, সেই কবি দত্তর সাথেই সৌজন্যের নামে গলা জড়িয়ে ধরতে দেখা গেল বিজেপি প্রার্থী ও অন্যান্য বিজেপি নেতৃত্ব কে। বিজেপি কর্মী সমর্থকদের একাংশ মনে করে করছেন কবি দত্ত উদ্দেশ্যপ্রণলিত ভাবে এই সৌজন্য মূলক সাক্ষাৎকারের নামে রামনবমীর মিছিলে অংশগ্রহণ করে তার বিরুদ্ধে ওঠা সকল অভিযোগকে সাইড লাইনে ফেলে দিলেন তা জলের মতন পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে সাধারণ শিল্পাঞ্চল বাসিন্দাদের মধ্যে। সাধারণ বিজেপি কর্মী সমর্থকরা এই ঘটনার পরে মনে করছেন যে একপ্রকার ‘ওয়াক ওভার’ দিয়ে দিল বিজেপি কবি দত্তকে আসন্ন নির্বাচনে। বিজেপি কর্মীদের একাংশ এও মনে করছেন কবি দত্ত যদি কোন কারণে নির্বাচনে হেরে যান, তাহলে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার রাস্তা তিনি আগে থেকেই পরিষ্কার করে রাখলেন।
অভিযোগ, পাল্টাও অভিযোগ ও সৌজন্যের সাক্ষাৎ সব কিছুরই প্রমাণ মিলবে আর মাত্র হাতে গোনা কয়েক দিন পরেই আগামী ৪ঠা মে সন্ধ্যায়, জলের মতন পরিষ্কার হয়ে যাবে আগামী দিনে দুর্গাপুর পশ্চিম কেন্দ্রে কে বিধায়ক হয়ে রাজত্ব করবেন।


















