নিজস্ব সংবাদদাতা, দুর্গাপুরঃ- ওভারলোডিং। না আছে চালান, না আছে পরিমানের পরিমাপ করা রিসিট কপি। গুরুত্বপুর্ন জাতীয় সড়কে শিকেয় উঠেছে নাকা চেকিং। অবাধে চলছে ‘অবৈধ’ বালি বোঝাই লরি। রাজ্যের কোষাগার যখন অর্থসঙ্কটে ভুগছে। অন্যদিকে তখন দৈনিক কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে চলছে গলসীর দামোদর নদের বিভিন্ন ঘাট থেকে বালি পাচারের অভিযোগ। অভিযোগ, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন মদতে চলছে অবৈধভাবে বালি পাচারের রমরমা কারবার। প্রশ্ন উঠেছে, ভুমি রাজস্ব, পরিবহন দফতর ও ট্রাফিক পুলিশের নজরদারিতে। এমনই নজিরবিহীন ছবি ধরা পড়ল ১৯ নং জাতীয় সড়কের ওপর বুদবুদ বাইপাসে।
প্রসঙ্গত, পানাগড় সম্প্রতি ধরলা মোড় থেকে পালশিট পর্যন্ত জাতীয় সড়ক ছয় লেন সম্প্রসারন হয়। মজবুত টেকসইয়ের জন্য আধুনিকমানের করা হয়েছে। সড়কের পুরোটাই সার্ভিস লেন রাখা হয়েছে। দুর্ঘটনা রুখতে সংযোগস্থলে আন্ডারপাস, উড়ালপুর করা হয়েছে। সুরক্ষার জন্য দু’কিলোমিটার অন্তর সিসিটিভি বসানো হয়েছে। এছাড়াও রাজ্য পুলিশের তরফে থানা ভিত্তিক নাকা চেকপোষ্ট ও আলাদা করে সিসিটিভি বসানো হয়েছে। চলছে সর্বক্ষণ নজরদারি। নজরদারির পরও পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডগায় দিনরাত চলছে অবৈধ বালি বোঝাই ওভারলোডিং লরি ডাম্পারের যাতায়াত। গলসীর দামোদরের শিকারপুর, শিল্ল্যাঘাট, সোদপুর ঘাট বৈধ ঘাট থেকেই উত্তোলন হচ্ছে ওইসব বালি। অভিযোগ, রাতের অন্ধকার নামতে ওভারলোডিং বালি পাচারের রমরমা কারবার শুরু হয়। বুদবুদ পানাগড়ে বিভিন্ন ঠিকাসংস্থার নির্মান কাজে ওইসব বালি জোগান দেওয়া হয়। ওভারলোডিং বালি বোঝাই লরি যাতায়াতের দরুন গলসী-১ নং ব্লকের সোদপুর, নিমডাঙা এলাকায় সেচ ক্যানেলের পাড়ের রাস্তায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ। প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার রাস্তার পিচ যেমন উঠে গেছে। তেমনই খানাখন্দে ভর্তি। যেখানে ১০ টন ভার নেওয়ার ক্ষমতা। সেই রাস্তায় ৪০-৫০ টনের ওপর বালি বোঝাই লরি যাতায়াত করছে। যার দরুন ক্যানেলের পাড় ধসে পড়ছে।

ওই ক্যানেলপাড় ভাঙলে যেমন কৃষি কাজে সেচের জল জোগান লাটে উঠবে। তেমনই বড়সড় ক্ষতির মুখে পড়বে গলসি-১ ও ২ নং ব্লকের কয়েক’শ হেক্টর জমির ধান চাষ। এতো গেল গ্রামীন রাস্তা। এবার আসা যাক, জাতীয় সড়কে। সন্ধ্যার অন্ধকার নামলে রমরমিয়ে ওইসব ঘাট থেকে ওভারলোডিং বালি বোঝাই লরি যাতায়াত শুরু হয়। জানা গেছে, বুদবুদের তিলডাঙা গ্রামের রাজেশ ওরফে রাজু নামে এক ব্যাবসায়ীর বালি সরবরাহ হয়। ভোর থেকে সকাল ৮ টা পর্যন্ত ৩০-৪০ টি বালি বোঝাই লরি ১৯ নং জাতীয় সড়কের সাধুনগরে সার্ভিস লেনে ও বুদবুদ বাইপাসের আন্ডার পাসে দাঁড়িয়ে থাকে। আর ওইসব ছ’চাকার লরিতে সাড়ে ১২৫০ (বারো’শ) থেকে ১৩০০ (তেরো’শ) সিএফটি অর্থাৎ ৪০-৫০ টন বালি ভর্তি থাকে বলে অভিযোগ।
পরিবহন দফতর সুত্রে জানা গেছে, ৬ চাকার লরিতে ১২ টন, ১০ চাকার লরিতে ২০ টন ও ১২ চাকার লরি ২৫ টন পর্যন্ত পন্য বোঝাই করতে পারে। কিন্তু মুনাফার লোভে তার থেকে কয়েকগুন বেশী বালি বোঝাই করে লরি। প্রায় ৪০-৫০ টন পর্যন্ত বালি বোঝাই অবাধে যাতায়াত করছে। বালির ওপর ঢাকা দেওয়া থাকে। ওভার লোডিং লরি যাতায়াতের ফলে সড়ক বসে যাচ্ছে। আবার রাস্তা বসে গিয়ে উচু ঢিপি হয়েছে মাঝে মধ্যে। বিপদজ্জনক দশায় পরিনত হচ্ছে সড়ক। আর প্রশ্ন এখানেই। সড়কের টেকসইয়ের জন্য ওভারলোডিং যানের ওপর নিষেধাজ্ঞা করা হয়। উল্টে ওই সড়কের ওপর দিয়ে অবাধে ওভারলোডিং বালি বোঝাই লরি ডাম্পারের আনাগোনা। জাতীয় সড়ক দুর্গাপুর আঞ্চলিক বিভাগের প্রজেক্ট ডিরেক্টর প্রমোদ কুমার জানান,” ওভারলোডিংয়ের দরুন সড়কের অনেক ক্ষতি হয়। টোলপ্লাজা ছাড়া ওভারলোডিং ধরার নিয়ম নেই। বিষয়টি সম্পুর্ন রাজ্য পরিবহন দফতরের এক্তিয়ারে।”

ওইসব বালি বোঝাই লরি চালকদের প্রশ্ন করা হলে, তারা কোন চালান দেখাতে পারেনি। এমনকি কোন ওয়েট স্লিপও দেখাতে পারেনি। অথচ দুই বর্ধমানের জেলা ও কমিশনারেট পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে জাতীয় সড়কের ওপর বেমালুম পেরিয়ে আসছে। দুই জেলার নাকা চেকিং পোস্ট, ডজন দুয়েক সিসিটিভি থাকলেও নজরেই পড়ে না ওভারলোডিং? আর তাতেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। পরিবেশকর্মী সুব্রত মল্লিক অভিযোগে জানান,” পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন মদতে চলছে অবৈধভাবে বালি পাচার চলছে। পুলিশ প্রশাসনের মদত না থাকলে এত বিপুল পরিমান ওভারলোডিং বালি পাচারে সাহস হয় কিভাবে বালি কারবারীদের? যার দরুন কোটি কোটি টাকা রাজস্ব সরকারের কোষাগারের বদলে নেতা, আমলাদের পকেটে ভর্তি হচ্ছে। এটা বড়সড় দুর্নীতি। তাই বিষয়টি নিয়ে মামলা দায়ের করা করবো।”
বিজেপির দুর্গাপুর-বর্ধমান সাংগঠনিক জেলার সহ সভাপতি রমন শর্মা বলেন,” বালিঘাট থেকে কোনরকম চালান ছাড়া অবাধে বালি লরি-ডাম্পারে পাচার হচ্ছে। রাজ্য সরকারি কোষাগারে টান পড়ছে। আর তৃণমূল নেতাদের পকেট ভরছে। রাজস্ব লোকসান হচ্ছে দৈনিক প্রায় কোটি টাকা। সবটাই ভাইপো ট্যাক্সে চলে যাচ্ছে। আর ভাইপোর পিসি টাকা নেই বলে নাটক করছে। পরিবহন আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে অবাধে চলছে ওভারলোডিং বালি বোঝাই লরি।”

প্রশ্ন, কিভাবে পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে প্রায় ২০-২৫ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে ওভারলোডিং বালি বোঝাই লরি ডাম্পার অনায়সে চলে আসছে? তাও আবার জাতীয় সড়কের মত গুরুত্বপুর্ন সড়কের ওপর দিয়ে। আরও প্রশ্ন, মোটরভেহিক্যাল ও পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে কিভাবে বৈধ চালান ছাড়া বেরিয়ে আসছে ওভারলোডিং বালি বোঝাই লরি? জানা গেছে, ওই বালি সরবরাহকারী নাকি রাজু ওরফে রাজেশ বলে অভিযোগ। বুদবুদের নাকি তিলডাঙা গ্রামের বাসিন্দা। গত ২০২৩ সালের আগষ্ট মাসে জাতীয় সড়কের তিলডাঙা মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠেছিল নাকি তার বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালে অবৈধ বালি পাচারের অভিযোগ করায় গলসী-১ নং ব্লকের এক বিজেপি নেতাকে হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে একাধিক অপরাধমুলক কাজকর্মের অভিযোগও নাকি রয়েছে বিভিন্ন থানায়। যদিও রাজেশ ওরফে রাজু অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,” সম্পুর্ন মিথ্যা অভিযোগ। সব গাড়ীতে চালানসহ বালি সরবরাহ করা হয়।” যদিও এবিষয়ে জেলা ভুমি রাজস্ব দফতর কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি। আসানসোল-দুর্গাপুর ট্রাফিক বিভাগের এসিপি রাজকুমার মালাকার বলেন,” নিয়মিত নাকা চেকিং হয়। বুদবুদের ওই এলাকায় অভিযান চালানো হবে।”



















