নিজস্ব সংবাদদাতা, দুর্গাপুরঃ- আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে শিল্পাঞ্চলে তৎপরতা তুঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলির। জোর কদমে চলছে প্রচার, জনসংযোগ কর্মসূচি। এরই মধ্যে দুর্গাপুর পশ্চিমের প্রাক্তন বিধায়ক বিশ্বনাথ পাড়িয়ালের সমাজ মাধ্যমের একটি পোস্ট ঘিরে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে শিল্পশহরের রাজনৈতিক মহলে। পোস্টে প্রাক্তন বিধায়ক লিখেছেন “যখন রাজনৈতিক দলগুলি একচেটিয়া পুঁজিপতিদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়…তখন শাসনের নামে শোষণ এবং সাধারণ নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হরণ হয়।” সমাজ মাধ্যমে পোস্ট করা এই তির্যক মন্তব্য ঘিরে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছে শিল্প শহরে।
প্রসঙ্গত, দুর্গাপুর পশ্চিমের আসনটি ফেরাতে এবার দুর্গাপুরের প্রতিষ্ঠিত হোটেল ব্যবসায়ী কবি দত্তকে প্রার্থী করে চমক দিয়েছে তৃণমূল নেতৃত্ব। এই আসনটিতেই গতবার প্রতিদ্বন্দ্বি বিজেপির লক্ষণ ঘোড়ুইয়ের কাছে বিপুল সংখ্যায় হেরে যান কংগ্রেস থেকে তৃণমূলে আসা বিশ্বনাথ পাড়িয়াল। অন্যদিকে দুর্গাপুর পূর্বের আসনটিতে চমক দিয়েছে বিজেপি। এই আসনে তৃণমূলের প্রার্থী তথা বিদায়ী বিধায়ক ও রাজ্যের মন্ত্রী প্রদীপ মজুমদারের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়কে। দুর্গাপুর শহরের পাশাপাশি রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় রিয়েল এস্টেট সহ চন্দ্রশেখরবাবুর একাধিক পারিবারিক ব্যবসা রয়েছে। যদিও প্রার্থীর দাবি তিনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে কোন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নন এবং তিনি তৃণমূলের মতো তোলবাজির টাকায় ব্যবসা করেন না। বরং পারিবারিক ব্যবসার টাকায় তিনি সমাজসেবা করেন। তাই সমাজ মাধ্যমেকে কি লিখল তাতে তার কিছু এসে যায় না।
এদিকে কবি দত্তের মতো একজন আপাদমস্তক ব্যবসায়ী আগামী দিনে বিধায়ক নির্বাচিত হলে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে কতটা সংবেদনশীল হয়ে উঠবেন তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। তিনি নিজের স্বার্থ দেখবেন নাকি জনগণের স্বার্থ? একজন মুনাফা কামানো ব্যবসায়ী নিজেরি স্বার্থ ত্যাগ করে কি সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াবেন? কবি দত্ত নিজের মুখেই প্রকাশ্যেই বহুবার বলেছেন তিনি কোন রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করেন না। স্বভাবতই প্রশ্ন থেকে যায় তাহলে সাধারণ তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীরা তাকে কোন বিশ্বাস ও ভরসায় ভোট দেবেন?
তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী কবি দত্তর যেভাবে গোটা শিল্প শহর জুড়ে নাম ও দলীয় চিহ্ন বিহীন কাট আউট লাগানো হয়েছে তা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। ওই কাটআউট গুলি দেখে প্রশ্ন তুলেছেন যে, এভাবে কাটআউট লাগানোর অর্থ কি তিনি নিজেকে মালিক আর বাকি সাধারণ শিল্পাঞ্চলবাসিকে কর্মচারী মনে করেন নাকি? আবার সামাজিক মাধ্যমে একাধিক ব্যক্তি নিজেদের পোস্টে লিখেছেন, “যে ব্যবসায়ী গান্ধী মোড় থেকে ডি ভি সি মোড় পর্যন্ত রাস্তার দু’ধারে কনকনে ঠান্ডা শীতের রাত্রে খোলা আকাশের নিচে থাকতে বাধ্য করেছিলেন, গরীব মানুষের দোকানঘর উচ্ছেদ করে কেড়ে নিয়েছিলেন তাদের রুজি রোটি, তিনি আবার রাজনৈতিক দলের জামা পরে গরীব দরদী হওয়ার ভান করছেন।” এমন নানা প্রশ্ন ঘোরাফেরা করছে শিল্পাঞ্চলের সাধারণ মানুষের মুখে। কারণ মূলত শ্রমজীবী মানুষের বাস এই শিল্প শহরে।
এদিকে বিশ্বনাথবাবু তাঁর পোস্টে কি দুর্গাপুর পূর্ব ও পশ্চিম এই দুই আসনেই ব্যবসায়ী প্রার্থী নিয়ে তির্যক কটাক্ষ করেছেন, নাকি তার লক্ষ্যবাণ শুধুমাত্র দুর্গাপুর পশ্চিম আসনটি লক্ষ্য করে? এই নিয়ে শিল্প শহরের রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর রাজনৈতিক তরজা ও জল্পনা।
এই পোস্ট নিয়ে দুর্গাপুর পূর্বের কংগ্রেস প্রার্থী তথা জেলা কংগ্রেসের সভাপতি দেবেশ চক্রবর্তী বলেন, “তৃণমূল বিজেপি দু’দলই পয়সা নিয়ে রাজনীতি করে। আর শাসকদলে তো দুর্গাপুরে ভূমিপুত্র কেউ নেই। এখানে, বিধায়ক সাংসদ সবাই বহিরাগত। তারাই এখানে রাজত্ব করছেন। এটা দুর্গাপুরের তৃণমূলের বড় অংশের ক্ষোভ। বহিরাগতরা বড় অঙ্কের টাকা উপঢৌকন দিয়ে এখানে প্রার্থী হন এবং পরবর্তীকালে তারা দুর্গাপুর থেকে লুট করে চলে যান। তাই নতুন করে এবিষয়ে কিছু বলার নেই।”
এদিকে দুর্গাপুর পশ্চিমের সিপিএম প্রার্থী প্রভাস সাঁই দাবি করেন, বিজেপি ও তৃণমূল দুটোই পুঁজিপতিদের দল। এই দলগুলো মুনাফা লোটার জন্য নির্বাচনে দাঁড়ানোর জন্য টাকা নেয়। পুঁজিপতিরা ক্ষমতায় এলে সাধারণ মানুষের শোষন হয়। বামপন্থীরাই একমাত্র শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য লড়াই করে।
অন্যদিকে ঘাষফুলে জোড় কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে যে তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক ভি শিবদাসনকে নাকি আসানসোলের সাত আসনের থেকে দূরে সরিয়ে দুর্গাপুর পশ্চিমে মনিটরিং করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে দলেক অন্দরের শুরু হয়েছে জল্পনা। অন্ডালের খাঁদরার জনসভায় মঞ্চে তৃণমূল সুপ্রিমো নাকি তাঁকে নিজে এই নির্দেশ দিয়েছেন।
দলের একাংশের মতে কর্পোরেট আভিজাত্যে অভ্যস্ত কবি দত্ত প্রার্থী হতেই দলের নিচুতলার কর্মী নেতাদের অনেকই নাকি দূরে সরে রয়েছেন। অনেকেরই মতে কবি দত্তের মতো অভিজাত ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্বকে রোদে জলে পুড়ে দল করা কর্মী নেতাদের না পসন্দ। ফলে ভোটের প্রচারে অনেকেই দূকত্ব রক্ষা করছেন। এমনকি বিশ্বনাথ পাড়িয়ালকেও দেখা যায়নি প্রার্থীর প্রচারে। তিনি আবার ভি শিবদাসনের ঘনিষ্ঠ বলে খবর। তাই অনেকেই মনে করছেন কবি দত্তের প্রতি না পসন্দ মেজাজে থাকা দলের কিছু নেতা কর্মীদের বাগে আনতে ভি শিবদাসনকে পাঠানো হয়েছে দুর্গাপুর পশ্চিমে । এদিকে দলীয় একটি সূত্রে খবর যে দুর্গাপুরের পশ্চিমের নেতারা কেউই ভি শিবদাসনকে কানাকড়িও মূলল্য দেন না । আর এই প্রেক্ষিতে ঘাসফুলের বাগানে জোর ফিসফাস, জীবনে একবারের জন্য কোন ওয়ার্ডে জয় না পাওয়া ভি শিবদাসন কি আদৌ কোন সাহায্য় করতে পারবেন দুর্গাপুর পশ্চিম আসনটির জন্য!
এদিকে দুর্গাপুর পশ্চিমের প্রার্থী এক সময় বিশ্বনাথ পাড়িয়ালের ছায়া সঙ্গী চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১১ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরে ঈর্ষনীয় উত্থান হয় তার। এক সময় বিশ্বনাথ পাড়িলের সঙ্গেই কংগ্রেস দল করতেন চন্দ্রশেখরবাবু। তখন থেকেই বিশ্বনাথ পাড়িয়ালের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। পরে বিশ্বনাথবাবুর সঙ্গেই শাসক দলে যোগ দেন চন্দ্রশেখর এবং ২০১২ সালে পুরনির্বাচনে দলের হয়ে টিকিটও পেয়ে যান। ভোটে জিতে কাউন্সিলরও নির্বাচিত হন। পরে ২০২৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশ্বনাথ বাবুর সঙ্গে ফের কংগ্রেসে যোগ দেন। এবার বামেদের সমর্থনে কংগ্রেসের হয়ে লড়ে দুর্গাপুর পশ্চিম আসনটি জেতেন বিশ্বনাথ পাড়িয়াল। কিন্তু পরে আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে না এলেও তৃণমূলের কংগ্রেসের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও কর্মসূচিতে যোগ দিতে থাকেন বিশ্বনাথবাবু ও তার ঘনিষ্ঠ চন্দ্রশেখর। এরপর তৃণমূলে থাকাকালীনই গত বিধান সভা নির্বাচনের আগে ২০২১ সালে শুভেন্দু অধিকারির সঙ্গে ঘাষফুল ছেড়ে পদ্মফুলে যোগ দেন চন্দশেখরবাবু। সব মিলিয়ে দলবদলু তকমা যোগ হয়ে গেছে তার নামের সঙ্গে।
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে দলবদলুদের ক্ষমা করেন না ভোটার। এর ভুরি ভুরি প্রমাণ রয়েছে অতীতে। গত বিধানসভা নির্বাচনে দুর্গাপুর পশ্চিমের আসনটিতেও তার প্রমাণ মিলেছে। অন্যদিকে ডজন ডজন দুর্নীতি,সরকারি জমি জবরদখল ও একাধিক বেআইনি কাজ কারবারের অভিযোগ থাকা একজন ব্যবসায়ীকে কতটা দুর্গাপুর পশ্চিম কেন্দ্রের সাধারণ ভোটাররা মেনে নেবেন তা নিয়ে প্রশ্ন চিহ্ন রয়েছে? বার বার দল বদল করা একজন ব্যক্তিকে কতটা বিশ্বাস করবে দুর্গাপুরের মানুষ তা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন রয়েছে? তবে এইসব প্রশ্নের উত্তরই অবশ্য জানা যাবে আগামী ৪মে।


















