এই বাংলায় ওয়েব ডেস্ক ,কলকাতাঃ- দেওয়ালি-ধনতেরাসের আগে নতুন শিল্পনীতি ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর, আগামী কয়েক মাসে ১ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগের আশাবাদী রাজ্য দেওয়ালি ও ধনতেরাসের আগে রাজ্যের শিল্পমহলের জন্য বড় ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শিল্পে বিনিয়োগ টানতে নতুন শিল্পনীতি ঘোষণা করল রাজ্য সরকার। একই সঙ্গে শিল্পপতিদের আশ্বস্ত করে মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা, রাজ্যে কোনও রকম তোলাবাজি বা গুন্ডাগিরি বরদাস্ত করা হবে না। তোলাবাজির অভিযোগ পেলেই দ্রুত পদক্ষেপ করা হবে। এমনকি, অভিযোগের ১৫ মিনিটের মধ্যে গ্রেফতারেরও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের ধ্বনি—ভরসা ইন, ভয় আউট।’’ শিল্পপতিদের সঙ্গে আলোচনায় মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন, সরকার এবং শিল্পপতি—উভয় পক্ষকেই স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজ করতে হবে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, নতুন শিল্পনীতির প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় পেশ করা হয়েছে। একাধিক মন্ত্রীর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার পরেই এই সিদ্ধান্ত। তাঁর কথায়, ‘‘দেওয়ালি, ধনতেরাসের পবিত্র সময়ের আগে আমরা নতুন শিল্পনীতি ঘোষণা করছি।’’ শিল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জমির সমস্যাকে অন্যতম বাধা হিসাবে চিহ্নিত করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্য সরকার নিজেই জমি কিনে ল্যান্ড ব্যাঙ্ক তৈরির পথে হাঁটবে। পানাগড়, হরিণঘাটা, রঘুনাথপুর-সহ একাধিক শিল্পতালুকে জমি রয়েছে। পাশাপাশি, নতুন করে জমি চিহ্নিত করে শিল্পপতিদের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। জোর করে জমি অধিগ্রহণের পথে যে তাঁর সরকার হাঁটবে না, তা-ও স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি।
শিল্পের জন্য জমির প্রসঙ্গে আগের বাম সরকারের নীতির সমালোচনা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলায় আগে কোনও সুস্পষ্ট জমি নীতি ছিল না। তাঁর অভিযোগ, জমি অধিগ্রহণ নিয়ে অনীহা এবং বিনিয়োগ-বিরোধী মনোভাবের কারণে রাজ্যে শিল্পের সম্ভাবনা ধাক্কা খেয়েছিল। নন্দীগ্রামের ঘটনাও এ প্রসঙ্গে তুলে ধরেন তিনি। তাজপুর গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প নিয়েও আগের সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, শিল্পপতি গৌতম আদানি ও করণ আদানি তাঁকে জানিয়েছিলেন, তাজপুরে সরকারের হাতে এক কাঠা জমিও ছিল না। সে ক্ষেত্রে কী ভাবে শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব, সেই প্রশ্ন উঠেছিল।
রাজ্যে কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, রাজ্যে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২ কোটির বেশি। পাশাপাশি প্রায় ৭০-৮০ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক কাজের সন্ধানে ভিন্রাজ্যে রয়েছেন। এই পরিস্থিতি বদলাতে শিল্পায়ন এবং বিনিয়োগকেই পাখির চোখ করতে চাইছে সরকার। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, সমুদ্র, নদী, বনাঞ্চল, খনিজ সম্পদ—শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদই রয়েছে বাংলায়। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া-সহ রাজ্যের বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর কথাও বলেন তিনি।
শিল্পপতিদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার ইতিবাচক। জমির ব্যবস্থা থেকে শুরু করে প্রশাসনিক সহযোগিতা—সব ক্ষেত্রেই সরকার পাশে থাকবে। উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও গুজরাতের জমি নীতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। বিনিয়োগকারীদের জন্য ইনসেনটিভ বা আর্থিক উৎসাহের রূপরেখা তৈরির কাজ চলছে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে রাজ্যে প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
আগের শিল্প সম্মেলনগুলির খরচ নিয়েও সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, অতীতে ১৬ লক্ষ কোটি টাকার মউ স্বাক্ষরিত হলেও বাস্তবে সেই অনুপাতে শিল্প আসেনি। শিল্প সম্মেলন আয়োজন করতে আগে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, শুধু সম্মেলন করে বা বড় বড় ঘোষণা দিয়ে শিল্পায়ন সম্ভব নয়, বাস্তবে কাজ করতে হবে। ‘‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কথা কম, কাজ বেশি। আমরাও কাজ করতে চাই।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘দ্য পাস্ট ইজ পাস্ট, লেট আস সে চরৈবেতি।’’
জমির মালিকানা এবং বিনিয়োগের বিষয়েও একাধিক বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। যাঁদের হাতে জমি রয়েছে, তাঁরা চাইলে সেখানে বিনিয়োগ করতে পারেন। জিন্দল গোষ্ঠীর হাতে থাকা জমির প্রসঙ্গও তোলেন তিনি। পাশাপাশি, রাজ্য সরকার নিজে জমি কিনে ল্যান্ড ব্যাঙ্ক তৈরি করবে, যাতে ভবিষ্যতে শিল্পপতিদের জমির জন্য অপেক্ষা করতে না হয়। তাঁর কথায়, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জমি আর বাধা হয়ে দাঁড়াতে দেওয়া হবে না।
কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিল্পের যোগসূত্র আরও মজবুত করতে কর্মযোগী প্রকল্প চালুর কথাও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। আইটিআইগুলিকে আরও উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে রাজ্যের। শিল্প সংস্থাগুলির প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষিত কতৈরি এবং ক্যাম্পাস থেকেই নিয়োগের ব্যবস্থা করতে উদ্যোগী সরকার। মুখ্যমন্ত্রী জানান, জিন্দল গোষ্ঠীর কর্ণধার সজ্জন জিন্দলকে তিনি আগামী জানুয়ারিতে সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পাসে গিয়ে সেখান থেকে কর্মী নিয়োগের বিষয়ে বলেছেন।
সিঙ্গুর নিয়েও ভবিষ্যতে বিশেষ উদ্যোগের ইঙ্গিত দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে সেই পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি। রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে তাঁর দাবি, সরকারের আয় ৪ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। একই সঙ্গে পাঁচ বছরে পাচার হয়ে যাওয়া সমস্ত টাকা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতির কথাও উল্লেখ করেন তিনি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান স্পষ্ট করে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, ‘‘না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা—এটাই আমাদের নীতি।’’
শিল্পপতিদের আশ্বস্ত করতে মুখ্যমন্ত্রী আরও এক বার বলেন, রাজ্যে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরিতে প্রশাসনকে সক্রিয় থাকতে হবে। কোনও রকম ভয় বা চাপের পরিবেশ তৈরি হতে দেওয়া হবে না। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা এখন সবে ব্রেকফাস্ট করছি। আমাদের নীতি—ইনভেস্ট ইন বেঙ্গল, গ্রো ইন বেঙ্গল।’’
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত, শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়, পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখার্জি, মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল, মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান উপদেষ্টা সুব্রত গুপ্ত-সহ রাজ্যের একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি ও শিল্পপতি।