এই বাংলায় ওয়েব ডেস্কঃ- ভারতে শব্দবাজি এবং বায়ু ও শব্দদূষণ রোধে সুপ্রিম কোর্ট এবং বিভিন্ন পরিবেশ আইনের অধীনে ও সরকারি কঠোর নিয়ম ও নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকলেও, বেআইনিভাবে সকলকে কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বেআইনি শব্দ শব্দবাজি রমরমা প্রতিবছরই দেখা যায় I এই নিষেধাজ্ঞা শুধু দিল্লি-এনসিআর নয়, পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের সব রাজ্যের জন্যই প্রযোজ্য। শুধুমাত্র নির্ধারিত মাত্রার কম দূষণকারী এবং অনুমোদিত 'সবুজ বাজি' নির্দিষ্ট কিছু শর্তসাপেক্ষে ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে। এছাড়াও শব্দসীমা সাধারণত উৎস থেকে ৪ মিটার দূরত্বে বাজির শব্দমাত্রা ৯০ ডেসিবেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার নিয়ম রয়েছে, এর বেশি শব্দ সৃষ্টিকারী চকলেট বোমা, দোদমা বা চেন ক্র্যাকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
তাই এ ব্যাপারে শ্রীমতি তৃপ্তি চক্রবর্তীর দ্বিতীয় মৃত্যু বার্ষিকীতে সম্মান জানাতে, বর্ধমান সোসাইটি ফর অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ারের স্রষ্টার স্মরণে, সোসাইটির সম্পাদক শ্রীমতি রিনা দাঁ, শ্রী শ্রীযুক্ত শীর্ষেন্দু সাধু, শ্রীমতি শচীন্দ্রানী ঘোষ, (চক্রবর্তী)সহ বিভিন্ন মেম্বার ও কর্মকর্তার ঐকান্তিক আবেদন রাখেন I
অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার সেক্রেটারি শ্রীমতি রিনা দাঁ বলেন, কালী পূজা ও দীপাবলির আনন্দের সময়ে বেআইনি তীব্র শব্দ বাজি এবং আলোর রোশনাই আমাদের জন্য উৎসবের আমেজ আনলেও, পোষা কুকুর বিড়াল পাখি থেকে গাছের পাখি এবং রাস্তার পথ কুকুর বিড়াল প্রাণিসহ গাছের পাখিসহ জীবজন্তুদের জন্য এই সময়টি চরম আতঙ্ক এবং শারীরিক কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ মানুষের শ্রবণশক্তির তুলনায় জীবজন্তুদের শোনার ক্ষমতা অনেক বেশি ও সংবেদনশীল হওয়ায় বাজির বিকট শব্দ তাদের ওপর মারাত্মক মানসিক ও শারীরিক প্রভাব ফেলে। শব্দ বাজির কারণে জীবজন্তুদের প্রধান অসুবিধাগুলি এবং তাদের সুরক্ষায় করণীয় বিষয়গুলি দেখা দরকার I
বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ড. সুভাষ চন্দ্র দত্ত তথা জাতীয় শিক্ষক ও মেন্টার বলেন জীবজন্তুদের প্রধান অসুবিধা ও সমস্যা হল: জীবজন্তুর মধ্যে তীব্র মানসিক আতঙ্ক ভয় ও যন্ত্রণা সৃষ্টি হয় I বাজির আকস্মিক ও বিকট শব্দে কুকুর, বিড়াল এবং অন্যান্য প্রাণীরা প্রচন্ড ভয় পায়। তারা বুঝতে পারে না এই আওয়াজ কোথা থেকে আসছে, কারা এই বাজি বা পটকা ফাটালো, যার ফলে তারা আতঙ্কে ঘরের কোণে, খাটের নীচে বা বাথরুমে বা গাড়ির নিচে বা গ্যারেজে লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করে। এর ফলে তাদের বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতা দেখা যায় I অনেক সময় অতিরিক্ত ভয়ের কারণে প্রাণীদের হৃৎস্পন্দন ও রক্তচাপ দ্রুত বেড়ে যায়। এর ফলে তাদের অতিরিক্ত লালা ঝরা, শরীর কাঁপানো, ঘন ঘন শ্বাস নেওয়া এবং বমি প্রস্রাব পায়খানা হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এমনকি সমাজের শ্রেষ্ঠ প্রাণী মানুষেরও বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ হৃদরোগে আক্রান্তসহ হার্ট অ্যাটাকের কারণও হতে পারে। এই সময় প্রাণীরা দিকভ্রান্ত হয়ে বিভিন্ন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে I রাস্তার কুকুর ও বিড়ালরা বাজির শব্দে প্রাণভয়ে ছুটোছুটি করতে গিয়ে প্রায়ই গাড়ির তলায় চাপা পড়ে বা রাস্তা হারিয়ে ফেলে। এমনকি প্রতি বছর দীপাবলির পর বহু পোষা কুকুরও ঘর থেকে পালিয়ে নিখোঁজ হয়ে যায়। অনেকে শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলে মানুষের মতো I আতশবাজির উচ্চ ডেসিবেলের শব্দ প্রাণীদের কানের পর্দার স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে, এমনকি তারা সাময়িকভাবে বা চিরতরে বধির হয়ে যেতে পারে।
দীপাবলিতে প্রতি বছর পাখিদের মৃত্যু ও বিপন্নতা দেখা যায় I বিশেষ করে যাযাবর বা পরিযায়ী পাখিদের ক্ষেত্রে মাইগ্রেশন বন্ধ করে দেয়। রাতে বাজির আলো ও শব্দে গাছে থাকা পাখিরা আতঙ্কিত হয়ে ওড়াউড়ি শুরু করে। অন্ধকারের মধ্যে দিশা হারিয়ে তারা বাড়ি-ঘর বা বিদ্যুতের খুঁটিতে ধাক্কা খেয়ে বা কারেন্ট খেয়ে মারা যায়। বাজির বিষাক্ত ধোঁয়াও শ্রেষ্ঠ প্রাণী মানুষের মত তাদের শ্বাসনালীর ক্ষতি করে। অনেক সময় আমাদের বাজির আনন্দে তাদের পুড়ে যাওয়ার মত ক্ষত সৃষ্টির ঘটনা ঘটে I অনেক সময় অসাবধানতাবশত বা কিছু মানুষের নিষ্ঠুরতার কারণে বাজি ফেটে রাস্তার নিরীহ কুকুর-বিড়ালদের গরুর শরীর পুড়ে যায় বা তারা গুরুতর আহত হয়।
তাই এই সময়ে জীবজন্তুদের সুরক্ষায় বিশিষ্ট সমাজসেবী ও পরিবেশবিদ শ্রীযুক্ত শীর্ষেন্দু সাধু বলেন, পোষা প্রাণীর জন্য ঘরের দরজা-জানলা বন্ধ রাখতে পারি I বাজি ফোটার সময় ঘরের সব দরজা ও জানলা বন্ধ করে ভারী পর্দা টেনে দিলে, বাইরের আলো ও শব্দ কম আসে। তাদের জন্য আমরা নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করতে পারি I ঘরের যে অংশে শব্দ সবচেয়ে কম আসে (যেমন ভেতরের কোনো ঘর বা বাথরুম), সেখানে আপনার পোষা প্রাণীর বসার বা লুকানোর ব্যবস্থা করে দিলে ভালো হয়। এই সময় আমাদের সারাদিন সঙ্গ দিয়ে তাদেরকে শান্ত রাখতে পারলে ভালো হয় l আতঙ্কের সময় তাদের একা না রাখা। ঘরের ভেতর হালকা আওয়াজে টিভি বা শান্ত মিষ্টি মধুর গান চালিয়ে রাখতে পারেলে, যা বাইরের বাজির শব্দকে কিছুটা কমিয়ে দেবে। তিনি মনে করেন বাড়ির পশুকে আগেভাগে খাওয়ানো ও হাঁটালে ভালো হয় I তাই সকলকে বিশেষ অনুরোধ, বাজি ফাটানো শুরু হওয়ার আগেই বিকেলে বা সন্ধ্যায় পোষা কুকুরকে বাইরে থেকে হাঁটিয়ে নিয়ে আসুন এবং রাতের খাবার খাইয়ে দিন।
ট্রাস্টের সভাপতি বলেন রাস্তার প্রাণীদের কে এই সময় খুব সহানুভূতি চোখে দেখতে হবে I পারলে সকলকে আশ্রয় দেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে আপনার বাড়ির গ্যারেজ, সিঁড়ির তলা বা বারান্দায় কোনো রাস্তার কুকুর বা বিড়াল আশ্রয় নিতে পারে এবং তাদের কে কখনোই তাড়িয়ে দেবেন না। কয়েক ঘণ্টার জন্য তাদের একটু নিরাপদ জায়গা অবশ্যই প্রয়োজন।
সকলকে এই জন্য সচেতনতা তৈরি করতে হবে l বিশেষ করে পাড়ার ছোটদের এবং অন্যদের বুঝাতে হবে ও দায়িত্ব দিতে হবে যাতে কেউ কোনো প্রাণীর দিকে বা তাদের আবাসের কাছাকাছি বাজি না ফাটান। ছোটদেরকে খাবার ও জল রাখার দায়িত্ব দিতে হবে এবং উৎসাহিত করতে হবে l ভয়ের কারণে রাস্তার প্রাণীরা দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকে। সম্ভব হলে আপনার বাড়ির আশেপাশে তাদের জন্য একটু খাবার ও জলের ব্যবস্থা উঠতে পারলে খুব ভালো হয়।
ড. দত্ত আরো বলেন যে নদী বা সমুদ্র উপকূলে আতশবাজি বর্জ্য পদার্থ জলে না ফেলা যাতে জলে জীব বৈচিত্র্য বজায় থাকে ও পরিবেশ জলদূষণ থেকেও রক্ষা পায় I
শ্রীমতি শচীন্দ্রানী ঘোষ বলেন কোনভাবেই প্রশাসনকে যেন বিস্ফোরক আইন প্রয়োগ করতে না হয় I কারণ নিষিদ্ধ বা অবৈধ শব্দবাজি কেনাবেচা বা মজুত করার অপরাধে পুলিশ সাধারণত বিস্ফোরক আইন, ১৮৮৪-এর ৯বি (১)(সি) ধারায় মামলা রুজু করে থাকে। এই ধারায় দোষী সাব্যস্ত হলে ৩ বছর পর্যন্ত কারাবাস এবং মোটা অঙ্কের জরিমানার বিধান রয়েছে। এছাড়া প্রাসঙ্গিক অন্যান্য ফৌজদারি আইনি ধারাও প্রয়োগ করা হয়।
তাই উৎসবের আনন্দ তখনই সম্পূর্ণ হয় যখন তা কারও কষ্টের কারণ না হয়ে ওঠে। শব্দহীন, পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ উপায়ে আলো জ্বালিয়ে উৎসব উদযাপন করলে আমরা এবং আমাদের চারপাশের অবলা জীবজন্তুরা সবাই ভালো থাকবে, জীব বৈচিত্র্য বজায় থাকবে এবং আমরা স্বর্গীয় শ্রীমতি তৃপ্তি চক্রবর্তীর দ্বিতীয় মৃত্যু বার্ষিকী সম্মান জানাতে পারব।