নিজস্ব সংবাদদাতা, দুর্গাপুর:- কালীপুজো ও দীপাবলি উপলক্ষ্যে শিল্পাঞ্চল জুড়ে যখন উৎসবের আমেজ, ঠিক তখনই মাতৃ অবমাননার এক নির্মম ছবি উঠে এল দুর্গাপুর ইস্পাতনগরীর বুকে। উৎসবের দিনেই এক অসহায় মহিলা ও তাঁর নাবালক সন্তানকে জোর করে কোয়ার্টার থেকে বের করে রাস্তায় বসিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠল। তবে ঘটনার কথা জানাজানি হতেই স্থানীয় বিধায়কের তৎপরতায় ও মানবিক হস্তক্ষেপে এদিনই মাথার উপরের ছাদ ফিরে পেলেন ওই অসহায় মা ও সন্তান।
ঘটনাস্থল দুর্গাপুর ইস্পাতনগরীর বি-জোনের মহেশকাপুর এলাকা। রবিবার সকালে এলাকার বাসিন্দারা দেখতে পান 1A/23 নম্বর কোয়ার্টারের বাসিন্দা বছর তিরিশের রূপা গাঙ্গুলী তাঁর সন্তানকে নিয়ে রাস্তার ধারে বসে কান্নাকাটি করছেন। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে ঘরের সমস্ত আসবাবপত্র ও জিনিসপত্র। বিষয়টি নজরে আসতেই প্রতিবেশী ও স্থানীয় সমাজসেবীরা দ্রুত ছুটে যান এবং ওই মা ও নাবালক পুত্রের খাবারদাবারের ব্যবস্থা করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, রূপাদেবী ডিভোর্সী। মাস তিনেক আগে নাবালক পুত্র সন্তান নিয়ে ওই কোয়াটারে ভাড়ায় থাকতে আসেন। এদিকে অভিযোগ শেখর ডোম নামক স্থানীয় এক তৃণমূল নেতা তাঁকে কোয়ার্টার্স কিনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রায় ১৫-২০ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেন। একদিকে উপার্জনের কোনো পথ না থাকা, অন্যদিকে জমানো সমস্ত টাকা খুইয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েন রূপা দেবী। ফলে তিনি ঘরভাড়া দিতে পারছিলেন না। অভিযোগ, তার জেরেই এদিন সকালে জিতু রায় কয়েকজন দুষ্কৃতীকে নিয়ে এসে রূপা দেবী ও তাঁর সন্তানকে একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে রাস্তায় বের করে দেন। ঘরের সমস্ত আসবাবপত্র বাইরে ফেলে দিয়ে কোয়ার্টারে তালা ঝুলিয়ে চলে যান।
ঘটনাটি জানতে পেরে স্থানীয় বাসিন্দা তথা বিশিষ্ট সাংবাদিক মনোজ সিংহ ফোনে জিতু রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলে, তিনি দাবি করেন যে বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বি-জোন ফাঁড়ির পুলিশের নির্দেশেই তিনি কোয়ার্টারে তালা লাগিয়েছেন। এই বক্তব্যের কথা জানাজানি হতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয়রা। তৎক্ষণাৎ স্থানীয় বিধায়কের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি গোটা বিষয়টি শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং কালীপুজোর দিনে এমন অমানবিক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। পাশাপাশি তিনি দ্রুত ওই অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দেন এবং স্থানীয় দলীয় নেতৃত্বকে নির্দেশ দেন অবিলম্বে মা ও সন্তানকে ঘরে ফেরানোর ব্যবস্থা করতে। সেই নির্দেশ মতো কিছুক্ষণের মধ্যেই স্থানীয় ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বিজেপি কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে তালা খুলে রূপা দেবী ও তাঁর সন্তানকে পুনরায় ঘরে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। তাঁদের সকাল ও রাতের খাবারের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি সবরকম সাহায্যের আশ্বাসও দেওয়া হয়। বিধায়ক ও স্থানীয় বিজেপি কর্মীদের এই মানবিক উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুর্গাপুর মিশ্র ইস্পাত কারখানার এই কোয়ার্টারটি জনৈক অবসরপ্রাপ্ত কর্মীর নামে তিন বছরের লিজে নেওয়া। কিন্তু স্থানীয় যুবক জিতু রায় নিজেকে ওই কোয়ার্টারের মালিক বলে পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সেটি ভাড়া খাটিয়ে আসছেন। এমনকি জিতু রায় নিজেও রাজেন্দ্র প্রসাদ এলাকায় একটি জবরদখল করা কোয়ার্টার্সে বসবাস করেন বলে দাবি স্থানীয়দের।
এদিনের ঘটনার পর অভিযুক্ত জিতু রায় ও শেখর ডোমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। অন্য কারোর নামে লিজে নেওয়া কারখানার কোয়ার্টার্স কীভাবে তৃতীয় ব্যক্তি ভাড়া খাটিয়ে অর্থ উপার্জন করছেন, তা নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে। প্রকাশ্য দিবালোকে এক অসহায় মহিলা ও তার সন্তানকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া এবং প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্তদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে বি-জোন ফাঁড়ির পুলিশ আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, পুলিশের তরফে কোয়ার্টারে তালা লাগানোর কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি। গোটা বিষয়টি সম্পূর্ণ অনৈতিক ও অমানবিক বলে উল্লেখ করে পুলিশ জানিয়েছে, লিখিত অভিযোগ দায়ের হলে ঘটনার তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।