লীনা গড়াই ও সুইটি চন্দ্র, দুর্গাপুর: বিজ্ঞান না ধর্ম কাকে বেছে নেবে শিল্পাঞ্চল দুর্গাপুর? মহাকুম্ভের তীব্র উন্মাদনার মাঝে এই প্রশ্নই এখন চাগাড় দিচ্ছে আমজনতা থেকে ছাত্রসমাজে – সর্বত্রই।
কারিগরী বিজ্ঞান ও শিক্ষা এই শহরে কুম্ভস্নান যাত্রার হিড়িক কি এবার তবে সত্যি সত্যিই ধুয়ে মুছে সাফ করে দেবে যুক্তিবাদী বিজ্ঞান চেতনা বা তার চর্চা? বিজ্ঞান দিবসের প্রাক্কালে – এটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন।

“ভাবার সময় এসেছে বিষয়টা। কুম্ভস্নানের ঢালাও আয়োজন খোদ সরকারি ব্যবস্থাপনায় যেভাবে চলছে, সেখানে যেভাবে ভিড় বাড়ছে তা আমাদের কাছে গৌরবের নয় – এটা জাতীয় লজ্জা বলে আমি মনে করি।”, মন্তব্য সৌরভ দত্ত’র। সৌরভ নিজে অবশ্য ঈশ্বর বিশ্বাসী নন। তিনি আদ্যন্ত একজন গোঁড়া কমিউনিস্ট এবং যুক্তিবাদী সমিতির পর এখন ‘মুক্ত চিন্তা’ নামের একটি প্রগতিশীল বিজ্ঞান সংস্থার সাধারণ সম্পাদক। তার মতে, “সরকার যখনই মানুষকে ভাত কাপড়ের যোগান দিতে পারেনা, তখন কখনো রাম মন্দির কখনো বা এরকম মহাকুম্ভের মতো ধর্মীয় উদ্মাদনা তৈরি করে।”
শুক্রবার দেশের জাতীয় বিজ্ঞান দিবস। সেই উপলক্ষে রাজের বিভিন্ন জায়গার পাশাপাশি শিল্পের শহর দুর্গাপুর জুড়ে প্রচারে নেমেছে এখনকার আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় বিজ্ঞান সোসাইটি। তাদের পক্ষ থেকে মানুষের মধ্যে বিজ্ঞান চেতনার বিকাশ ঘটাতে শহরে বেশ কয়েকটি জায়গায় পথসভা, বিজ্ঞান প্রসারের বই বিক্রির অস্থায়ী স্টলও করা হয়েছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শুক্রবার শহরে জাতীয় বিজ্ঞান দিবস উদযাপন করা হবে। সংস্থাটি গত কয়েক বছর ধরে সমাজে কুসংস্কার বিরোধীপ্রচার, বিজ্ঞান চেতনা ও মননশীল পরিবেশ গড়ে তোলার কাজ করে চলেছে নিজেদের মতো করেই। যদিও, আধুনিক বিজ্ঞান নির্ভর এই শহরে বিজ্ঞান প্রসারে কি স্থানীয় বাসিন্দারা কি ছাত্র-ছাত্রীর সমাজ – কোন তরফ থেকেই বিশেষ সদর্থক সাড়া তারা অবশ্য পাচ্ছেন না বলেই বোঝা যাচ্ছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ড: উৎপল দেবনাথ বুধবার বলেন, “আমাদের কাজ মানুষের মধ্যে সুস্থ বিজ্ঞান চেতনা প্রসার ঘটানো। এর জন্য সারা বছর ধরেই আমরা নানান প্রদর্শনী, সেমিনার, শিক্ষা সংক্রান্ত আলোচনা সভার আয়োজন করে থাকি।” বুধবারও সিটি সেন্টার বাসস্ট্যান্ডে সংগঠনটি বিজ্ঞান বিষয়ক বইয়ের একটি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে । সংগঠনের সক্রিয় সদস্য জয়ন্ত মন্ডল ও আফতাব হোসেন বলেন, “আমরা লাগাতার আমাদের মতো করে চেষ্টায় আছি এবং থাকবো এই বিশ্বাসের সাথে যে সাধারণ মানুষের বিজ্ঞান মানস্কতার প্রতি ঝোঁক একসময় বাড়বেই।” তারা প্রচেষ্টায় আছেন ঠিকই, তবে এত চেষ্টার পরও সংগঠনের সদস্য সংখ্যা কেবলমাত্র ৯২ জন!

দুর্গাপুর শহর থেকে এই বছর কুম্ভস্নানে প্রয়াগ রাজের সঙ্গমে গিয়ে ‘চিত্তশুদ্ধি’ করে এসেছেন দু লক্ষ মানুষ। দুর্গাপুরের বিজেপির দলীয় আহ্বায়ক অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায় এদিন বলেন, “মানুষের মধ্যে এবার দারুন উৎসাহ ছিল। প্রায় ২ লক্ষ মানুষ নিজেদের মতো করে, পকেটের পয়সা খরচ করে কুম্ভে গেছেন। একি কম কথা নাকি? এটা মানুষের আবেগ।” শুক্রবারের আসন্ন বিজ্ঞান দিবস উদযাপনের জন্য কি আয়োজন করছেন অমিতাভরা, বা তার দল? এ প্রশ্নের জবাবে অমিতাভ বলেন, “না তেমন কিছু করা হচ্ছে না।”কেন? জানতে চাইলে বিরক্ত অমিতাভ ফোনের সংযোগ দু’বার কেটে দিলেন। অর্থাৎ, বিজ্ঞান চেতনার প্রসারে অমিতাভদের উৎসাহ বিশেষ নেই, বলেই মনে করা যেতে পারে।
ভারতের পদার্থ বিজ্ঞানী ড: সি ভি রামণের পদার্থ বিজ্ঞানে যুগান্তকারী সাফল্য ছিল ‘রমন এফেক্ট’। ১৯২৮ সালের ২৮ শে ফেব্রুয়ারি ডাক্তার রামন এই আবিষ্কারটি সামনে আনেন। এই আবিষ্কারের জন্য ১৯৩০ সালে তাকে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। আর তার এই কালজয়ী আবিষ্কারের সম্মানে ১৯৮৬ সালে ভারত সরকার ২৮ ফেব্রুয়ারিকে ‘জাতীয় বিজ্ঞান দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে।
দুর্গাপুর জুড়ে রয়েছে ছটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, তিনটি মেডিকেল কলেজ সহ ডজনখানেক আধুনিক উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখানে রয়েছে ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার ‘মহাগুরু’ প্রতিষ্ঠান বলে চিহ্নিত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি বা এন আই টি। সেই এন আই টির অধ্যক্ষ ড: অরবিন্দ চৌবের আক্ষেপ-‘মহাকুম্ভ শেষই হয়ে গেল, অথচ আর মহাস্নানে যাওয়াটাই হলনা!” তিনি বুধবার বলেন,”ছ বছর পর আবার হবে, তখন যাবো।” জাতীয় বিজ্ঞান দিবস উদযাপনে এবার ঠিক কি কি ব্যবস্থা নিচ্ছে এন আই টি – এ প্রশ্নের জবাবে ড: চৌবে বলেন, “ওসব আমি ঠিক বলতে পারবো না।” একথা বলেই তিনি বিজেপি নেতা অমিতাভ’র মতোই ফোনের সংযোগ কেটেই দিলেন।
“তাহলেই বুঝুন এখন কোথায় চলছে এই দেশ!” – আক্ষেপ বিজ্ঞান সোসাইটির জয়ন্ত মন্ডলের ।
আশঙ্কা দুর্গাপুরের – তবে কি এবার মহাকুম্ভে ডুবেই গেলেন স্যর সি ভি রমন!





