এই বাংলায় ওয়েব ডেস্ক ,কলকাতাঃ- রিলায়্যান্সের বড় বিনিয়োগের বার্তা বাংলায়। নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে সংস্থার শীর্ষ কর্তারা, ডেটা সেন্টার থেকে বিদ্যুৎ, কেবল ল্যান্ডিং স্টেশন থেকে ফুড পার্ক—একাধিক প্রকল্পের সম্ভাবনা। গণেশ পুজোর আমন্ত্রণ রক্ষা করতে মুম্বইয়ে রিলায়্যান্স কর্তা মুকেশ আম্বানীর বাসভবন ‘অ্যান্টিলিয়া’-য় গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেই সফরেই মিলেছিল বাংলায় নতুন বিনিয়োগের ইঙ্গিত। মুম্বই থেকে ফিরে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, রিলায়্যান্সের একটি প্রতিনিধি দল তাঁর সঙ্গে বৈঠক করতে বাংলায় আসবে। বুধবার সন্ধ্যায় সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হল নবান্নে। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসলেন রিলায়্যান্স ইন্ডাস্ট্রিজ়-এর সিইও তরুণ ঝুনঝুনওয়ালা-সহ সংস্থার একাধিক শীর্ষ কর্তা। রাজ্যে একাধিক ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রের খবর।
সূত্রের খবর, বাংলায় একাধিক বড় প্রকল্প করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে রিলায়্যান্স। তার মধ্যে রয়েছে ডেটা সেন্টার, আন্তর্জাতিক কেবল ল্যান্ডিং স্টেশন, কয়লা থেকে গ্যাস উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, ফুড পার্ক, সড়ক পরিকাঠামো এবং হাসপাতাল তৈরির মতো প্রকল্প। অর্থাৎ, তথ্যপ্রযুক্তি থেকে জ্বালানি, পরিকাঠামো থেকে খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ এবং স্বাস্থ্য পরিষেবা—বিনিয়োগের একাধিক ক্ষেত্রে সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে সংস্থা। এদিনের বৈঠকের পরেই অবশ্য কোনও একটি প্রকল্পের চূড়ান্ত ঘোষণা হচ্ছে না। বরং প্রকল্প ধরে ধরে আরও একাধিক বৈঠক হবে বলে জানা গিয়েছে। কোন প্রকল্পের জন্য কত জমি প্রয়োজন, কোথায় সেই জমি দেওয়া সম্ভব, পরিকাঠামোগত সুবিধা কী রয়েছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রশাসনিক ভাবে কী কী সহযোগিতা প্রয়োজন, সেই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। রাজ্য সরকারের তরফে প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলির জন্য সম্ভাব্য জমির বিস্তারিত তথ্যও রিলায়্যান্সের প্রতিনিধিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
রিলায়্যান্স সূত্রে, জমি সংক্রান্ত বিষয়গুলি চূড়ান্ত হওয়ার পর আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলির কাজ পুরোদমে শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে তার আগে সংস্থার প্রতিনিধিরা সম্ভাব্য জমিগুলি এবং অন্যান্য পরিকাঠামো খতিয়ে দেখবেন। সেই পর্যালোচনার পরেই প্রকল্পের আকার, বিনিয়োগের পরিমাণ এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। এই প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপে আরও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। সূত্রের খবর, মুকেশ আম্বানী নিজে বাংলায় এসে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে বিনিয়োগের রূপরেখা চূড়ান্ত করতে পারেন। বুধবারের বৈঠককে সেই বৃহত্তর বিনিয়োগ-পর্বের প্রাথমিক ধাপ হিসাবেই দেখছে প্রশাসনিক মহল।
নজরে দিঘার কেবল ল্যান্ডিং স্টেশন, রিলায়্যান্সের প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলির মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে দিঘায় আন্তর্জাতিক কেবল ল্যান্ডিং স্টেশন। সমুদ্রের নীচ দিয়ে যাওয়া ডেটা কেবলের মাধ্যমে এই স্টেশন বাংলাকে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করবে। ফলে রাজ্যে ডেটা সেন্টার, ক্লাউড পরিষেবা, ডিজিটাল পরিকাঠামো এবং তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর শিল্পের পরিধি আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। ডিজিটাল পরিকাঠামোর পাশাপাশি জ্বালানি ক্ষেত্রেও রিলায়্যান্সের আগ্রহ রয়েছে বলে সূত্রের খবর। বিশেষ করে কয়লা থেকে গ্যাস উৎপাদনের প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যে সব কয়লাখনি থেকে প্রচলিত পদ্ধতিতে কয়লা তোলা কঠিন বা অর্থনৈতিক ভাবে সম্ভব নয়, সেই সব খনিকে এই প্রযুক্তির আওতায় আনার সম্ভাবনা রয়েছে। ভূগর্ভস্থ কয়লার নিয়ন্ত্রিত দহনের মাধ্যমে গ্যাস উৎপাদনের এই পদ্ধতিতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে বলেই সূত্রের খবর।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও , রিলায়্যান্স আগ্রহ প্রকাশ করেছে। রাজ্যে ইতিমধ্যেই বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীগুলির বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ এগোচ্ছে। জিন্দাল গোষ্ঠী ৮০০ মেগাওয়াটের দু’টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ করছে। সূত্রের খবর, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে আদানী গোষ্ঠী।
সিলিকন ভ্যালিতে ইতিমধ্যেই জমি, তথ্যপ্রযুক্তি পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে রিলায়্যান্সের উপস্থিতি অবশ্য ইতিমধ্যেই রয়েছে। রাজারহাটের সিলিকন ভ্যালি হাব-এ রিলায়্যান্সকে ৪০ একর জমি দেওয়া হয়েছে। সেখানে নির্মাণকাজও শুরু হয়ে গিয়েছে। নতুন প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে এই পরিকাঠামোকে আরও বিস্তৃত করার সম্ভাবনাও রয়েছে।
সরকারি সূত্রের বক্তব্য, শিল্পের জন্য জমি এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো নিশ্চিত করাই এখন অন্যতম অগ্রাধিকার। রিলায়্যান্সের প্রতিনিধিদের হাতে যে সম্ভাব্য জমিগুলির তথ্য দেওয়া হয়েছে, তা খতিয়ে দেখার পর সংস্থা প্রয়োজন অনুযায়ী জমি বেছে নেবে। তার পরেই সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরি হবে।
কর্মসংস্থানেই জোর সরকারের, শুধু বিনিয়োগের অঙ্ক নয়, প্রকল্পগুলি বাস্তবায়িত হলে কত কর্মসংস্থান তৈরি হবে, সেই বিষয়টিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে রাজ্য সরকার। শিল্প প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি এবং পরোক্ষ—দুই ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে প্রশাসনের আশা। মুখ্যমন্ত্রীও একাধিক বার জানিয়েছেন, নতুন শিল্প বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। রিলায়্যান্সের প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে সেই কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাকেই সামনে রেখে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে এগোতে চাইছে সরকার। জমি এবং পরিকাঠামো সংক্রান্ত বিষয়গুলি দ্রুত মিটিয়ে ফেলার ক্ষেত্রেও প্রশাসনের তরফে সহযোগিতার বার্তা দেওয়া হয়েছে।
‘অনেক বিনিয়োগ হবে, দেখতে থাকুন’ , মুম্বইয়ে মুকেশ আম্বানীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর কলকাতায় ফিরে মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘‘অনেক বিনিয়োগ হবে, দেখতে থাকুন।’’ বুধবার মেদিনীপুরের বীরসিংহ গ্রামে বিদ্যাসাগরের জন্মভিটেতে একটি অনুষ্ঠানে গিয়েও রিলায়্যান্সের সঙ্গে বৈঠকের প্রসঙ্গ তোলেন তিনি। জানান, সে দিনই রিলায়্যান্স কর্তাদের সঙ্গে তাঁর বৈঠক রয়েছে। সেখানে ইতিবাচক আলোচনা হবে এবং বাংলায় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলেও বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নবান্নে হল রিলায়্যান্সের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক। ফলে মুম্বই সফরের পর যে বিনিয়োগের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী, বুধবারের বৈঠককে তারই পরবর্তী ধাপ হিসাবে দেখছে প্রশাসনিক মহল।
অতীতের ঘোষণা, এ বার বাস্তবায়নের অপেক্ষা আগের তৃণমূল জমানাতেও মুকেশ আম্বানী একাধিক বার রাজ্যের বাণিজ্য সম্মেলনে উপস্থিত হয়েছিলেন। বিভিন্ন সময়ে বাংলায় বিনিয়োগের কথাও জানিয়েছিলেন তিনি। তবে সেই ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবে কতটা বিনিয়োগ এসেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এ বার শিল্পপতিদের সামনে সেই পুরনো প্রশ্ন যাতে না থাকে, তার জন্য জমি, পরিকাঠামো এবং প্রশাসনিক সহযোগিতার বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বার্তা দিয়েছে বর্তমান সরকার।
মুখ্যমন্ত্রীও আগেই জানিয়েছেন, বিনিয়োগের পথে কোনও কিছু বাধা হয়ে দাঁড়াতে দেওয়া হবে না। রিলায়্যান্সের ক্ষেত্রেও সেই নীতিই কার্যকর করতে চাইছে সরকার। জমি চিহ্নিতকরণ থেকে প্রকল্পের পরিকাঠামো, প্রশাসনিক অনুমোদন থেকে বাস্তবায়ন—প্রতিটি পর্যায়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। তবে এখনই বিনিয়োগের চূড়ান্ত অঙ্ক বা প্রকল্পের নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি। বুধবারের বৈঠক মূলত সম্ভাব্য প্রকল্প এবং জমি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনার পরবর্তী ধাপ। আগামী দিনে আরও একাধিক প্রকল্পভিত্তিক বৈঠকের পরেই কোন প্রকল্প কোথায় হবে, কতটা জমি লাগবে, বিনিয়োগের পরিমাণ কত এবং কাজ কবে থেকে শুরু হবে—তা স্পষ্ট হবে। নবান্নের বুধবারের বৈঠক একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—বাংলায় রিলায়্যান্সের বিনিয়োগের সম্ভাবনা এখন আর শুধু বাণিজ্য সম্মেলনের মঞ্চে ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জমি চিহ্নিতকরণ থেকে প্রকল্পের সম্ভাব্য রূপরেখা—বিনিয়োগকে বাস্তব রূপ দেওয়ার প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এখন নজর মুকেশ আম্বানীর পরবর্তী বৈঠকের দিকে। তাঁর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকের পরই বাংলায় রিলায়্যান্সের বিনিয়োগের প্রকৃত পরিধি এবং প্রকল্পগুলির চূড়ান্ত রূপরেখা সামনে আসতে পারে।