নিজস্ব প্রতিনিধিঃ- পাহাড়ের কুয়াশা ঘেরা সবুজ উপত্যকা আর নির্জনতা উপভোগ করতে অনেকেই উৎসবের মরশুমে শহরের কোলাহল ছেড়ে উত্তরবঙ্গে ছুটে যান। কিন্তু এবার পাহাড়ে ঘুরতে গিয়েও খোদ হোমস্টে-র আঙিনায় খাঁটি বাঙালি বাড়ির আবহ এবং দুর্গাপুজোর আনন্দ পেয়ে আপ্লুত পর্যটকরা। দার্জিলিংয়ের সিটং-৩ মহকুমার অন্তর্গত ছবির মতো সুন্দর পাহাড়ি গ্রাম লাটপাঞ্চার। সেখানেই অবস্থিত জনপ্রিয় হোমস্টে ‘লোটাস প্যারাডাইস হোমস্টে’। এই হোমস্টের মালিক খোন্ডারকর পারভেজ আলি এবার নিজের হোমস্টে চত্বরেই আয়োজন করেছেন শারদোৎসবের।
কোনো আড়ম্বর নয়, বরং সম্পূর্ণ শাস্ত্রীয় ও ঐতিহ্য রীতি মেনে পুরোহিত ডেকে এখানে মায়ের আরাধনা করা হচ্ছে। হোমস্টেতে বেড়াতে আসা বাঙালি পর্যটকদের জন্য পুজোয় পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া থেকে শুরু করে অষ্টমীর মহাপ্রসাদ ও ভোগের নিখুঁত ব্যবস্থা রেখেছেন পারভেজ আলি। মালিকের এই অভিনব উদ্যোগে শুধুমাত্র সমতলের পর্যটকরাই নন, পাহাড়ের স্থানীয় গ্রামবাসীরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে শামিল হয়েছেন।
এমন এক ঘরোয়া দুর্গাপুজো পেয়ে আনন্দিত ঘুরতে আসা পর্যটকরাও। এমনই এক বাঙালি পরিবার জানান, "পাহাড়ে নিরিবিলিতে ঘুরতে এসে হোমস্টের ভেতরেই পুজো পাব, অঞ্জলি দিতে পারব বা ভোগের প্রসাদ খেতে পারব—সেটা ভাবিনি। এটা আমাদের কাছে বাড়তি পাওনা। পাহাড়ি প্রকৃতির মাঝে এই পুজো আমাদের ছুটির আনন্দকে এক অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে।"
ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে এই শারদোৎসবের আয়োজন করার ভাবনা কীভাবে এল? এ প্রসঙ্গে খোন্ডারকর পারভেজ আলি জানান, "বাঙালির কাছে দুর্গাপুজো শুধু কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচার নয়, এটি একটি চিরন্তন ঐতিহ্য এবং আবেগ। পুজোয় যারা দূর-দূরান্ত থেকে পাহাড়ে ঘুরতে আসছেন, তারা যেন সেই চেনা আবেগ ও উৎসবের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হন, সেই ভাবনা থেকেই এই উদ্যোগ নেওয়া।"
নিজের ব্যক্তিগত জীবন ও সম্প্রীতির বার্তা তুলে ধরে পারভেজ আরও যোগ করেন, "আমার দেশের বাড়ি বর্ধমানে। ছোটবেলা থেকেই সমস্ত ধর্মের মানুষের সঙ্গে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে মিলেমিশে বড় হয়েছি। পরিবার থেকেও সবসময় সেই ধর্মনিরপেক্ষতার শিক্ষাই দেওয়া হয়েছে। তাই ঈদ, ক্রিসমাস, দুর্গাপুজো বা দীপাবলি—আমি সবকিছুতেই সমানভাবে অংশ নিই এবং সবার সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতে ভালোবাসি। আমার লোটাস প্যারাডাইসেও ধর্মের কোনো ভেদাভেদ নেই, এখানে সব উৎসবই সমান মর্যাদায় উদযাপিত হয়।"
খুব বেশি দিনের পুরনো না হলেও লাটপাঞ্চারের এই হোমস্টেটি এরইমধ্য়ে পর্যটকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে এর প্রিমিয়াম তথা ভিআইপি স্তরের পরিষেবা এবং চমৎকার আতিথেয়তার জন্য। এখানে বাঙালি এবং দক্ষিণ ভারতীয় সহ বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু খাবারের ব্যবস্থা থাকে। তবে সবচেয়ে বিশেষত্ব হলো, পর্যটকদের চাহিদা অনুযায়ী কাস্টমাইজড খাবার তৈরি করে দেওয়া। পারভেজ আলির কথায়, "অনেক পর্যটকই সারাদিন পাহাড়ি রাস্তায় ঘোরাঘুরির পর রাতে একটু হালকা, বাড়ির মতো খাবার খেতে চান। তাদের জন্য আলু সেদ্ধ, ডিম সেদ্ধ, ডাল সেদ্ধ কিংবা গরম গরম ঘি-ভাতের মতো একেবারে ঘরোয়া পদেরও ব্যবস্থা করা হয়।"
শীতের রাতে পর্যটকদের বিনোদনের জন্য এখানে সম্পূর্ণ নিরাপত্তা ও সতর্কতার সাথে আউটডোর বার্বিকিউ এবং ক্যাম্প ফায়ার বা বোনফায়ারের চমৎকার আয়োজন করা হয়। পারভেজ আলি জানান, আসন্ন শীতের মরশুমের জন্য ইতিমধ্যেই বহু পর্যটক তাদের অগ্রিম বুকিং সেরে ফেলেছেন। শীতকালে লাটপাঞ্চার ও সিটং এলাকার মূল আকর্ষণ থাকে কমলালেবুতে ভরে থাকা স্থানীয় কমলার বাগান। পাশাপাশি, শীতের মরশুমে এই পাহাড়ি অঞ্চলে বহু (প্রায় আড়াইশো প্রজাতির) পাখির দেখা মেলে, যা পাখিপ্রেমী এবং ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফারদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
সব মিলিয়ে, আসন্ন শীতের ছুটিতে কুয়াশার চাদর গায়ে মেখে, হিমেল পাহাড়ি হাওয়ায় নির্জনতায় কয়েকটি দিন কাটাতে দার্জিলিংয়ের অফবিট গ্রাম লাটপাঞ্চারের এই প্যাগোডা স্টাইল হোমস্টেটি গন্তব্য হতেই পারে।