মনোজ সিংহ, দুর্গাপুরঃ- চলচ্চিত্র জগতের মিস্টার নাটোবর লালের কাহিনী কমবেশি সকলেরই জানা আছে। কিন্তু চলচ্চিত্র সাথে বাস্তব জীবনেও যে ওই রকম চরিত্রের মানুষ দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে বসবাস করে জেনে অবাক হচ্ছেন শিল্পাঞ্চলের বাসিন্দারা। এক দরিদ্র তপশিলি জাতির যুবককে কাজ পাইয়ে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে কয়েক কোটি টাকার তছরুপ এর অভিযোগ এসেছে এক বাপ-বেটার বিরুদ্ধে দুর্গাপুরে। ইতিমধ্যেই ভারতীয় ন্যায় সংহিতার প্রায় ডজন খানেক জামিন অযোগ্য ধারায় অভিযোগ নদীভুক্ত হয়েছে শিল্পাঞ্চলের কোক ওভেন থানাতে।
দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের কোক ওভেন থানা অন্তর্গত সগড়ভাঙা গোপীনাথপুর মৌজায় বসবাসকারী এক তপশিলি জাতি অন্তর্ভুক্ত গরিব সম্বলহীন যুবককে ব্যবহার করে কয়েক কোটি টাকার প্রতারণা হয়েছে বলে অভিযোগ দায়ের হয়েছে কোক ওভেন থানাতে। স্থানীয় মিলন ধীবর নামক ওই তপশিলি জাতি অন্তর্ভুক্ত যুবক থানায় তার লিখিত অভিযোগে জানিয়েছেন, তিনি এসসি (ধিবার) সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত এবং তার এসসি জাতিগত শংসাপত্র নম্বর C0004815, যা ২৮/১২/২০০৭ তারিখে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দুর্গাপুরের মহকুমা শাসক (SDO) কর্তৃক ইস্যু করা হয়েছিল। তিনি 'প্রজেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপার্স প্রাইভেট লিমিটেড' (CIN: U70102WB2009PTC132242; অফিস: জেপি এভিনিউ, দুর্গাপুর-৭১৩২১১), প্রজেশ চ্যাটার্জি (DIN: 053529290, পিতা: অমিতজিৎ চ্যাটার্জি), অমিতজিৎ চ্যাটার্জি (পিতা: তাপস চ্যাটার্জি)—যারা উভয়েই উক্ত কোম্পানির পরিচালক এবং সাগড়ভাঙ্গা, দুর্গাপুর (থানা: কোক ওভেন, পিন: ৭১৩ ২১৯)-এর বাসিন্দা—সেই সাথে সুমিত কেশ (ম্যানেজার, প্রজেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপার্স লিমিটেড) এবং তাদের অন্যান্য সহযোগীদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে প্রতারণা, অসাধু উপায়ে সম্পত্তি হস্তান্তরে প্ররোচনা, চুরি, প্রতারণার উদ্দেশ্যে জালিয়াতি, জালিয়াতির উদ্দেশ্যে সিল ও প্লেট তৈরি বা নকল করা, হিসাব বিকৃত করা, কম্পিউটার রিসোর্স ব্যবহার করে ছদ্মবেশ ধারণের মাধ্যমে প্রতারণা, এসসি/এসটি শংসাপত্রের প্রতারণামূলক অপব্যবহার, ডিজিটাল পরিচয় চুরি (Digital Identity Theft), ডিজিটাল সিগনেচার সার্টিফিকেট (DSC) সংক্রান্ত জালিয়াতি, ফাঁকা নথিতে জালিয়াতি, অননুমোদিতভাবে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা এবং 'তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতি (অত্যাচার প্রতিরোধ) আইন, ১৯৮৯' ও 'অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন, ২০০২'-এর অধীনে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছে ।
১. প্রজেস চ্যাটার্জি এবং অমিতজিৎ চ্যাটার্জি—উভয়েই তার গ্রামের বাসিন্দা। ২০১৬ সালে দুর্গাপুরের 'দুর্গাপুর প্রজেক্টস লিমিটেড'-এ একটি চুক্তিভিত্তিক চাকরি পেতে অমিতজিৎ চ্যাটার্জি তাকে সহায়তা করেছিলেন। এর বিনিময়ে তাঁরা তার নামে কয়েকটি ট্রাক কিনতে চেয়েছিলেন। পরবর্তীতে, এসসি (SC) কোটার সুবিধা হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রজেস চ্যাটার্জি ও অমিতজিৎ চ্যাটার্জি তাকে সামনে রেখেছিলেন।
২. ২০২১ সালে উক্ত প্রজেস চ্যাটার্জি ও অমিতজিৎ চ্যাটার্জি তাকে জানান যে, আইওসিএল (IOCL) হলদিয়া ও দুর্গাপুরের জন্য এলপিজি (LPG) পরিবহনের একটি টেন্ডার আহ্বান করেছে এবং সেখানে প্রায় ৫০০টি ট্রাকের প্রয়োজন। তাঁরা তাকে জানান যে তার নামে প্রায় ৪০টি ট্রাক কেনা হবে যার জন্য কয়েক কোটি টাকা খরচ হবে। তাঁরা এর জন্য বিনিয়োগকারীর ব্যবস্থা করবেন এবং ব্যাংক থেকে কিছু ঋণও নেওয়া হবে। তাঁরা আরও জানান যে, ট্রাক কেনার জন্য অর্থ বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে তাঁরা তমলুকের নিমতৌড়ির বাসিন্দা সন্দীপ কুইলার ব্যবস্থা করেছেন। এবং তাঁর সাথে একটি চুক্তিও সম্পন্ন করেছেন। পরবর্তীতে ব্যবসার আয় থেকে আরও কিছু ট্রাক তার নামে কেনা হয়। তিনি অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল ও অসচ্ছল এবং ৬০টি ট্রাক কেনার মতো কোনো আর্থিক সামর্থ্য তার নেই।
৩. প্রজেস চ্যাটার্জি, অমিতজিৎ চ্যাটার্জি, প্রজেস ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপারস প্রাইভেট লিমিটেড এবং অন্যান্যদের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে তিনটি এফআইআর (FIR) দায়ের করা হয়েছিল—যথা তমলুক থানার ২০২৩ সালের ৩৮৭ নম্বর মামলা, ভবানীপুর থানার ২০২৪ সালের ৯৪ নম্বর মামলা এবং তমলুক থানার ২০২৪ সালের ১০৩১ নম্বর মামলা।
৪. এফআইআর (FIR) দায়ের হওয়ার পর তিনি জানতে পারেন যে, প্রজেশ চ্যাটার্জি, অমিতজিৎ চ্যাটার্জি, প্রজেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপারস প্রাইভেট লিমিটেড এবং তাদের সহযোগীরা প্রতারণামূলক ও অসৎ উদ্দেশ্যে পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুকের কুলবেড়িয়া এলাকার নিমতৌড়ির বাসিন্দা সন্দীপ কুইলাকে ট্রাক কেনার জন্য অর্থ বিনিয়োগ করতে প্ররোচিত করেছিলন। ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন লিমিটেডের হলদিয়া ও দুর্গাপুর এলপিজি (LPG) বটলিং প্ল্যান্টের জন্য এলপিজি পরিবহনের দুটি টেন্ডারে ব্যবহারের লক্ষ্যে এই ট্রাকগুলো কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সেই অসৎ প্ররোচনায় প্রভাবিত হয়ে সন্দীপ কুইলা ট্রাকের বডি তৈরি, বিমা পলিসি, রেজিস্ট্রেশন, কর, পারমিট, সিএলএলআই (CLLI) পলিসি, ফ্লোর রাবার ম্যাট ও অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডার কেনা এবং ট্রাক চলাচলের জন্য জ্বালানি ইত্যাদির পেছনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেছিলেন। পরবর্তীতে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সন্দীপ কুইলাকে আরও প্রলুব্ধ করে জ্বালানি পাম্পে ডিজেলের মূল্য পরিশোধ, লুব্রিকেন্ট ও ডিইএফ (DEF) ক্রয়, দৈনন্দিন খরচ, চালক ও আনলোডার/ট্রাক ল্যাম্পারদের পারিশ্রমিক, ম্যানেজার/মুন্সির পারিশ্রমিক, টোল ট্যাক্স (নগদ ও ফাস্ট-ট্যাগ উভয়ই), ট্রাকের রক্ষণাবেক্ষণ, নিয়মিত রোড ট্যাক্স প্রদান এবং বিমা নবায়ন ইত্যাদির জন্য আরও কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে বাধ্য করেছিলেন ।
৫. প্রজেশ চ্যাটার্জি, অমিতজিৎ চ্যাটার্জি এবং 'প্রজেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপারস প্রাইভেট লিমিটেড'-এর লোকজন ও প্রতিনিধিরা আমার ছদ্মবেশ ধারণ করে আমার পরিচয় ব্যবহার করেছেন। তিনি পুলিশের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন এটা যাচাই করার জন্য যে, চুক্তির মেয়াদকালে—বিশেষ করে যখন ঠিকাদারের সশরীরে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক ও আবশ্যিক ছিল—তিনি কি কখনও দুর্গাপুর ইন্ডেন এলপিজি বটলিং প্ল্যান্ট, আইওসিএল (IOCL) হলদিয়া এলপিজি বটলিং প্ল্যান্ট বা আইওসিএল-এর অফিসে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন কি না? আইওসিএল-এর সাথে চুক্তি এবং দৈনন্দিন কাজকর্মের বিষয়ে তিনি শ্রম কমিশনার, পুলিশ বা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের মতো কোনো বিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষের সামনে কখনও সশরীরে উপস্থিত হননি। তিনি পুলিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন মিলন ধীবরের নামে থাকা সেই ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোর দিকে, যেখানে আইওসিএল নিয়মিতভাবে পরিবহন বিলের অর্থ জমা করে আসছে; অথচ ওই অ্যাকাউন্টটি তার পরিবর্তে শুধুমাত্র প্রজেশ চ্যাটার্জিই পরিচালনা করছেন।
৬. অভিযুক্ত প্রজেশ চ্যাটার্জি এবং অমিতজিৎ চ্যাটার্জি সুপরিকল্পিতভাবে তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন সিম কার্ড (৬২৯৬২৪৫০৩৫), ইমেইল আইডি (dhibarmilan.md@gmail.com), ব্যাংক অ্যাকাউন্ট (ক্যানারা ব্যাংক, IFSC-CNRB0004163, A/C No-120000043250 এবং HDFC ব্যাংক, IFSC-HDFC0005318, A/C No-50200062684830), এটিএম কার্ড, আইওসিএল (IOCL), বিপিসিএল (BPCL) ও এইচপিসিএল (HPCL)-এর ভেন্ডর কোড ও ফ্লিট কার্ড অ্যাকাউন্ট এবং যোগাযোগ সংক্রান্ত পরিকাঠামোর ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছেন।
শুধু এখানেই শেষ নয়, এই বাপ-বেটার কুকীর্তি সহ আরো বহু নথি নাকি ইতিমধ্যেই পুলিশের কাছে নথিভূক্ত হয়েছে। একটি বিশ্বস্ত সূত্র মারফত জানা গেছে, শুধু ওই মিলন ধীবরই নয়, শিল্পাঞ্চল তথা রাজ্যের আরো বহু ব্যক্তি নাকি এই বাপ-বেটার জালিয়াতি, প্রতারণা ও সুপরিকল্পিত প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়ে সর্বোচ্চ খুইয়েছেন। আগামী পর্বে আমাদের পাঠকদের জন্য থাকবে তার বিস্তারিত বিবরণ। চলবে.............