নিজস্ব সংবাদদাতা, কাঁকসা:- সেদিন ছিল প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার আনন্দের দিন। বুকে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি থেকে মলানদিঘী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দিকে রওনা দিয়েছিল সাত বছরের এক বালক। কিন্তু স্কুলে পৌঁছানো মাত্রই কানে আসে এক স্তব্ধ করে দেওয়া দুঃসংবাদ—আততায়ীর গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছে জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর শরীর। মুহূর্তের মধ্যে থমকে যায় সেই বালকের স্কুলযাত্রা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কান্নায় ভেঙে পড়ে বাড়ি ফিরেছিল সে। আজ প্রায় আট দশক পর, ৮৬ বছর বয়সে এসেও স্বাধীনতা দিবসের পুণ্যলগ্নে সেই স্মৃতি হাতড়ে আবেগে চোখ ভিজল কাঁকসার সুবলচন্দ্র মণ্ডলের।
আজ থেকে প্রায় ৭৮ বছর আগের সেই ক্ষণটি আজও সুবলবাবুর স্মৃতিতে দগদগে। ১৯৪৮ সালের ৩০শে জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধীর প্রয়াণ সংবাদের জেরে কাঁকসার ওই গ্রামীণ বিদ্যালয়ে সেদিন ভর্তি প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। সুবলবাবু বলেন, "সেদিন স্কুলে ভর্তি হতে না পারার দুঃখ ছিল, তবে তার চেয়েও অনেক বেশি কষ্ট হয়েছিল গান্ধীজির মৃত্যুর খবর শুনে। তখন থেকেই বাপুজির প্রতি আমার মনে এক গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার জন্ম নেয়।"
বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়লেও গান্ধীজির আদর্শ থেকে একচুলও নড়েননি এই বৃদ্ধ। প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস, সাধারণতন্ত্র দিবস কিংবা গান্ধীজির জন্ম ও প্রয়াণবার্ষিকী এলেই তিনি হাতে জাতীয় পতাকা ও মহাত্মার ছবি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন এলাকার চেনা রাস্তায়। নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ও মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর অবিস্মরণীয় অবদানের কথা।
এ বছরের স্বাধীনতা দিবসের সকালেও কাঁকসার মলানদিঘী সংলগ্ন এলাকায় দেখা গেল সেই চেনা ছবি। এলাকার খুদে শিশুদের জড়ো করে তাদের হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দিচ্ছেন সুবলচন্দ্র মণ্ডল। নিজের শৈশবের সেই কান্নার দিনের কথা শোনানোর পাশাপাশি তিনি নতুন প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেন, গান্ধীজি শুধু ইতিহাসের পাতায় থাকা কোনো চরিত্র নন, তিনি দেশের স্বাধীনতার এক জীবন্ত স্তম্ভ। বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করাই এখন ৮৬ বছরের এই বৃদ্ধের জীবনের অন্যতম ব্রত।