নিজস্ব সংবাদদাতা, আসানসোল : - হিমালয়ের সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গও মাউন্ট জগৎসুখ ( ৫,০৫০ মিটার) জয় করে নজির গড়ল আসানসোলের গোপালপুর রুপতাপস অ্যাডভেঞ্চার ক্লাবের সদস্যরা। হিমাচল প্রদেশের কুল্লু উপত্যকায় অবস্থিত হিমালয়ের 'পীর পঞ্জাল' পর্বতশ্রেণীর দুটি অত্যন্ত পরিচিত ও জনপ্রিয় পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট জগৎসুখ ( ৫,০৫০ মিটার) ও মাউন্ট দেওটিব্বা (৬,০০১ মিটার) । দুর্গম পাহাড়ি পথ, প্রতিকূল আবহাওয়া, তীব্র ঠান্ডা এবং উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে এই শৃঙ্গ জয় যথেষ্টই চেলেঞ্জিং ছিল। এই সফল অভিযানের মাধ্যমে ক্লাবের সদস্যরা শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা, ধৈর্য ও দলগত সমন্বয়ের মতো কঠিন পরীক্ষায় অত্যন্ত সফলভাবে নিজেদের প্রমানিত করতে সক্ষম হয়েছেন। ক্লাব সদস্যদের মতে শুধু পর্বতের উচ্চতা স্পর্শ করাই তাদের লক্ষ্য ছিল না বরং নিজেদের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করারও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চেয়েছিলেন তাঁরা।
গত ২৯ আগস্ট আসানসোল রেলস্টেশন থেকে শুরু হয় গোপালপুর রুপতাপস অ্যাডভেঞ্চার ক্লাবের সদস্যদের যাত্রা। হিমালয়ের দুর্গম পথ, অজানা পরিবেশ এবং কঠিন চ্যালেঞ্জকে সঙ্গী করে জাতীয় পতাকা ও ক্লাবের পতাকা নিয়ে নতুন কিছু করার প্রত্যয়ে এগিয়ে চলেন অভিযাত্রীরা। এই অভিযানের টিম লিডার ছিলেন কৌশিক চট্টরাজ। তাঁর নেতৃত্বে এই কঠিন পর্বত অভিযানে সঙ্গী হন ১৬ জন ক্লাব সদস্য- অর্পিতা ব্যানার্জি, সুজয় মণ্ডল, সৌম্যদীপ রুদ্র, তুহিনা সিং সর্দার, কাঞ্চন চট্টরাজ , শ্রুতি পাল, সংযুক্তা মণ্ডল, পৃথিস মণ্ডল, সৌভিক চক্রবর্তী, পার্থ গড়াই, রজত মহলানবীর, অর্পণ সেন, শত্রুঘন শাহ এবং শ্যামসুন্দর পাল।

দলনেতা কৌশিক চট্টরাজ জানান, চলতি মাসের ১ সেপ্টেম্বর ছিক্কা থেকে সেরি, তেন্তা হয়ে জগৎসুখ পর্বতের চূড়ায় উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হয় এবং ৪ তারিখ রাত ১১ টার সময় পর্বতের চুড়ায় পৌছানোর উদ্দেশ্যে রওনা দেয় টিম। পর্বতের শিখরে সকলে পৌঁছে যান সকাল আটটার সময়। সেখানে ভারতের জাতীয় পতাকা এবং ক্লাব পতাকা উত্তোলন করে, পুজো দিয়ে সকলে ক্যাম্পেফিরে আসেন। এরপর লক্ষ্য ছিল দ্বিতীয় পর্বত শৃঙ্গ মাউন্ট দেওটিব্বা। এই শৃঙ্গ জয়ের অভিযানে টিমের ৫ সদস্য কৌশিক চট্টরাজ, অর্পিতা ব্যানার্জি, সৌমদীপ রুদ্র, অর্পণ সেন এবং সুজয় মণ্ডল অংশ নেন ও যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু আরোহনের সময় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয় তাঁদের। পাহাড়ের উপর থেকে বড় বড় বোল্ডার ছুটে আসে তাদের যাত্রা পথে। তাতে টিমের দুই সদস্য গুরুতর জখম হন। ফলে আরোহন স্থগিত রেখে নিচে নামার সিদ্ধান্ত নিতে হয় তাঁদের।
পর্বতের কঠিন অভিযান শুধুমাত্র অভিযাত্রীর শারীরিক সক্ষমতা, পাহাড়ি পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সম্পর্কে ধারণাই শেষ কথা নয় বরং তাঁর দলগত সমন্বয় ও দলের সদস্যদের প্রতি মানসিকতার বিষয়টিও বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাই যে কোন পর্বত অভিযান শারীরিক মানসিক ক্ষমতার পাশাপাশি অভিযাত্রীর মানবিক দিকটিও তুলে ধরে।
সফল অভিযাত্রীরা জানান, এই পর্বত অভিযানে তাঁদের একটাই প্রত্যাশা ছিল, সফলভাবে অভিযান সম্পন্ন করে নিরাপদে ফিরে আসা এবং নিজেদের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আরও অনেক তরুণ-তরুণীকে পর্বতারোহণ ও প্রকৃতির প্রতি আকৃষ্ট ও অনুপ্রানিত করা। এই অভিযানকে ঘিরে ইতিমধ্যেই রুপতাপস অ্যাডভেঞ্চার ক্লাবের সদস্য ও অভিযাত্রীদের মধ্যে নতুন করে উৎসাহ ও উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে।
রুপতাপস অ্যাডভেঞ্চার ক্লাবের এই উদ্যোগ আসানসোল তথা পশ্চিমবঙ্গের অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের ক্ষেত্রেও একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। পর্বতারোহণ, প্রকৃতিপ্রেম, শৃঙ্খলা, সাহসিকতা এবং দেশপ্রেমের মানসিকতা গড়ে তোলে। শহর ও মফস্সলের তরুণ প্রজন্মকে মোবাইল ও ভার্চুয়াল জগতের বাইরে এনে প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত করা এবং শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা বিকাশে উৎসাহিত করা, তাদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলা আজকের দিনে বিশেষ প্রয়োজন। সেই দিক থেকে এই অভিযান নিছক একটি পর্বতারোহণ কর্মসূচি নয়, বরং নতুন প্রজন্মের মধ্যে সাহস, শৃঙ্খলা, প্রকৃতিপ্রেম ও আত্মবিশ্বাস তৈরির একটি সামাজিক উদ্যোগ বলেই মনে করছেন ক্লাব কর্তৃপক্ষ।