এই বাংলায় ওয়েব ডেস্ক ,কলকাতাঃ - একটা ছেলে কাঁদছে। চারপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে ভেসে আসে—‘‘কাঁদছ কেন? তুমি তো ছেলে!’’ শৈশবের সেই একটি বাক্যই হয়তো অনেক পুরুষের জীবনের প্রথম ‘নিষেধাজ্ঞা’। চোখের জল আটকে রাখার। কষ্ট লুকিয়ে রাখার। বুকের ভিতর জমে থাকা কথাগুলিকে গোপন রাখার। তার পর বয়স বাড়ে। স্কুল পেরোয়, কলেজ পেরোয়, চাকরি আসে, সংসার আসে, দায়িত্ব আসে। কোথাও সম্পর্ক ভাঙে, কোথাও স্বপ্ন ভাঙে। কর্মক্ষেত্রে চাপ বাড়ে, পরিবারে অশান্তি হয়, একাকিত্ব গ্রাস করে। কখনও বা নির্যাতনের শিকারও হন পুরুষেরা। তবু চোখের জল আসে না। আসলে আসে। কিন্তু জল গড়িয়ে পড়ার আগেই সমাজের শেখানো সেই পুরনো বাক্যটি যেন হাত বাড়িয়ে চোখ মুছে দেয়—‘পুরুষ মানুষ কাঁদে না।’
সামনেই দুর্গাপুজো। দেবী দুর্গা শক্তির প্রতীক। মহিষাসুর বধের সেই পৌরাণিক কাহিনি যুগের পর যুগ নারীশক্তির জাগরণের প্রতীক হয়ে আছে। পুজোর মণ্ডপে, আলোয়, প্রতিমায়, আলোচনায় উঠে আসবে সেই শক্তির নানা রূপ।কিন্তু সেই শক্তির উৎসবের আবহেই কি এক বার অন্য একটি প্রশ্ন তোলা যায় না? পুরুষের কষ্টের কথা কে বলবে? এই প্রশ্নটিই সামনে এনে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে ‘মনের জ্যোতি ফাউন্ডেশন’। পুরুষদের মানসিক যন্ত্রণা, না-বলা কথা এবং সামাজিক ও মানসিক সমস্যাগুলিকে আলোচনার কেন্দ্রে আনতে শুরু হয়েছে বিশেষ ক্লাস ও কর্মশালা। বার্তাটি আপাত ভাবে খুব সহজ—কষ্ট হলে কাঁদুন। মন খারাপ হলে বলুন। সাহায্য চাইতে লজ্জা নেই। নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করবেন না।
প্রথম ধাপে ১১ থেকে ১৮ বছর বয়সি কিশোরদের নিয়ে পাঁচ দিনের বিশেষ ক্লাস ও কর্মশালা শুরু হয়েছে। লক্ষ্য, ছোট বয়স থেকেই ছেলেদের বোঝানো—অনুভূতি প্রকাশ দুর্বলতা নয়। কান্না পরাজয়ের চিহ্ন নয়। বরং নিজের মনের কথা স্বীকার করার মধ্যেও সাহস আছে। তবে উদ্যোগটি শুধু কিশোরদের মধ্যে আটকে থাকছে না। শিশু-কিশোর থেকে যুবক, তার পরে বিভিন্ন বয়সের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ—ক্রমে সকলের কাছে পৌঁছতে চায় সংস্থা। পশ্চিমবঙ্গের গণ্ডি পেরিয়ে গোটা দেশে এই কাজ ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যও রয়েছে।
কারণ, ১৫ বছরের ছেলের কষ্ট আর ৪৫ বছরের পুরুষের কষ্ট এক নয়। একজন হয়তো পরীক্ষার ফল, বাবা-মায়ের প্রত্যাশা, বন্ধুত্ব কিংবা নিজের পরিচয় নিয়ে লড়ছে। অন্য জনের ঘাড়ে সংসারের ভার, কর্মক্ষেত্রের অনিশ্চয়তা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক চাপ কিংবা নিঃসঙ্গতা। কোথাও আবার নির্যাতনের অভিজ্ঞতা। সমস্যার ধরন আলাদা, কিন্তু না-বলা যন্ত্রণার জায়গাটি একই। সেই জায়গাতেই পৌঁছতে চাইছে এই উদ্যোগ। সাইকোলজিস্ট, কাউন্সেলর এবং প্রশিক্ষকেরা রয়েছেন এই কর্মসূচিতে। প্রথমে শোনা হচ্ছে তাঁদের কথা। বোঝার চেষ্টা হচ্ছে সমস্যার গভীরতা। তার পরে প্রয়োজন অনুযায়ী মানসিক চাপ সামলানোর কৌশল শেখানো হচ্ছে। যাঁদের প্রয়োজন, তাঁদের কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথও দেখানো হচ্ছে।
নারীশক্তির উত্থান অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু পুরুষের অনুভূতিকে অস্বীকার করে কোনও সুস্থ সমাজ তৈরি হতে পারে না। কারণ ‘শক্ত পুরুষ’ মানেই অনুভূতিহীন পুরুষ নয়।বরং কখনও নিজের চোখের জলকে স্বীকার করে নেওয়াই সবচেয়ে বড় শক্তি।দেবীর হাতে অস্ত্র থাকে। অসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থাকে। কিন্তু মানুষের ভিতরের অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সব সময় অস্ত্র লাগে না। কখনও লাগে দু’টি কান—যে কান মন দিয়ে শুনবে। কখনও লাগে একটি হাত—যে হাত কাঁধে এসে বলবে, ‘কাঁদতে পারো।’
এই পুজোয় তাই দেবীর আরাধনার পাশাপাশি হয়তো উচ্চারিত হতে পারে আর একটি কথাও—
ছেলেদেরও কষ্ট হয়।
ছেলেরাও ভেঙে পড়ে।
ছেলেরাও কাঁদে।
আর সেই কান্না লুকিয়ে রাখার নয়।
কারণ চোখের জলেরও কোনও লিঙ্গ নেই।