মনোজ সিংহ, দুর্গাপুরঃ- পশ্চিমবঙ্গের বুকে প্রথম বার ভারতীয় জনতা পার্টির সরকার গঠন হয়েছে মাত্র কয়েকদিন আগেই। মুখ্যমন্ত্রী মাননীয় শুভেন্দু অধিকারী দায়িত্বভার গ্রহণ করার সাথে সাথেই একাধিক দুর্নীতি ও বেনিয়মের বিরুদ্ধে একপ্রকার যুদ্ধ ঘোষণা করে দিয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গের তিন দশকের বাম শাসন ও পরে ১৫ বছরের তৃণমূল শাসন কালে রাজ্যজুড়ে এক নৈরাজ্য তৈরি হয়েছিল বলে বহু অভিযোগ রয়েছে। একাধিক বিনিয়ম, দুর্নীতি ও সরকারি জমি দখলের ঘটনা সামনে এসেছিল, কিন্তু বিশেষ কোনো সম্প্রদায়, ব্যক্তি ও সংস্থাকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে বিদায়ী সরকার গুলি কাজ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে অনেক আগে থেকেই। এবার পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কোমর বেঁধে নেমেছেন সমস্ত বিনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করার উদ্দেশ্যে।
সম্প্রতি কলকাতার তিলজলা এলাকায় গত ১২ মে তপসিয়ায় এক বহুতলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ২ জনের মৃত্যু হয়। তিনজনকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পাঁচতলার ওই বহুতলটি বেআইনি বলে জানা যায়। সেখানে চামড়ার কারখানা ছিল। সেই ভবনের পাশের ভবনটিও অবৈধ বলে জানা যায় কলকাতা পুরসভার রেকর্ড ঘেঁটে। এই আবহে তপসিয়ার ৫০/১ জিজে খান রোডের ঠিকানায় থাকা বাড়িটিকে ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তারপরই বুলডোজার নিয়ে সেখানে চলে যায় পুলিশ এবং পুর কর্তৃপক্ষ। রাতেই ভাঙা শুরু হয় বাড়ি। সেই সময় স্থানীয়রা বিক্ষোভ দেখান। তাঁদের অভিযোগ, “এই বাড়ি এবং ব্যবসা বৈধ তবে পুলিশ তাদের কোনও কাগজ দেখাতে দিচ্ছে না।” তিলজলা কাণ্ডের পরই শুভেন্দু জানিয়েছিলেন, কলকাতায় বেআইনি কোনও নির্মাণের কথা সরকার জানলেই তাদের জলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে, সিইএসসি-কে বলে বিদ্যুৎ সংযোগও কাটিয়ে দেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন, রাজ্যের কোথায় কোথায় এই ধরণের অবৈধ কারখানা বা সংস্থা চলছে, তা চিহ্নিত করতে অবিলম্বে অভ্যন্তরীণ অডিট বা সমীক্ষা চালাতে হবে।
এদিকে শিল্পাঞ্চল দুর্গাপুরেও প্রশাসনের উদ্যোগে শুরু হয়ে গিয়েছে দুর্নীতি, বেআইনি নির্মাণ ও সরকারি জমি দখল করার বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ। একটি সূত্র মারফত জানা গেছে, শিল্পাঞ্চল দুর্গাপুরে এমন বেশ কয়েকটি ভবন ও বেসরকারি নির্মাণ রয়েছে যা সম্পূর্ণ বেআইনি ভাবে তৈরি করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেই সমস্ত বেআইনি নির্মাণ ও তার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভারতীয় আইন মোতাবেক কড়া পদক্ষেপ এর ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র সিটি সেন্টার এর বুকে গত কয়েক বছর আগেই হঠাৎ গজিয়ে ওঠা এক হাসপাতালে বিরুদ্ধে একাধিক বেনিয়মের অভিযোগ এসেছে প্রশাসনের কাছে বলে সূত্র মারফত জানা গেছে। অভিযোগ দুর্গাপুরের সিটি সেন্টারে অবস্থিত ‘লাইফ কেয়ার’ হাসপাতালের একাধিক বিনিয়ম সরকারের নজরে এসেছে যার মধ্যে অন্যতম হলো ‘ফায়ার লাইসেন্স’ বা ফায়ার অনুমতি ছাড়াই চলছে ওই হাসপাতাল। শতাধিক রুগী ও তাদের পরিবারবর্গ সহ ওই হাসপাতালের সকল কর্মীবৃন্দরা এক যদুগৃহে কর্মরত আছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কলকাতার তিলজলা কান্ডের পরই রাজ্যের নতুন ভারতীয় জনতা পার্টির সরকার এবার কড়া পদক্ষেপ নিতে চলেছে বলে সূত্র মারফত জানা গেছে। দুর্গাপুরে সিটি সেন্টারে অবস্থিত এই ‘লাইফ কেয়ার’ হাসপাতালের বিরুদ্ধে আগেও বহুবার গুরুতর উঠেছিল কিন্তু তৎকালীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের অত্যন্ত প্রিয় বেশ কয়েকজন জমি মাফিয়া, কয়লা মাফিয়া ও কুখ্যাত প্রোমোটারদের মালিকাধীন থাকা এই হাসপাতালের গায়ে হাত দেওয়ার সাহস করেনি তৎকালীন প্রশাসন। এখন রাজ্যে নতুন সরকার ‘জিরো টলারেন্সের’ নীতি নিয়ে উক্ত ওইসব বেআইনি ব্যবসার বিরুদ্ধে প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে চলেছে বলে জানা গেছে। এই ‘লাইফ কেয়ার’ হাসপাতালের পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে ‘তপবন হেলথ কেয়ার’ নামক এক সংস্থা। সূত্র মারফত জানা গেছে, ‘তপবন হেলথ কেয়ার’ ও লাইফ কেয়ার হাসপাতালের যে চারজন মালিক রয়েছেন তারা হলেন পঙ্কজ মুখার্জী ও তার স্ত্রী , মধুসূদন সাহা, ও অনুপ পুরোকায়স্থ।
এখন প্রশ্ন শিল্পাঞ্চলের সকল প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা এই লাইফ কেয়ার হাসপাতাল সম্বন্ধে কি কিছুই জানেন না, নাকি তারা এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বহু মানুষের প্রাণহানির জন্য অপেক্ষা করছেন? দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের কোন কোন ব্যক্তিত্ব এই লাইফ কেয়ার হাসপাতালকে বেআইনি ভাবে চালাতে সাহায্য করেছে তাদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে তদন্ত কি করা হবে?
রাজ্যের প্রাক্তন শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্গাপুরের কোন হেভি ওয়েট ব্যবসায়ী নেতা বেশ কয়েক বছর ধরে এই হাসপাতালের সকল বেআইনি কার্যকলাপ কে চালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে তারও যথাযথ তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের সাধারণ বাসিন্দারা।
“চ্যানেল এই বাংলায়” এর হাতে এমন বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য এসেছে এই লাইফ কেয়ার হাসপাতাল ও তার মালিকদের বিরুদ্ধে যা জানলে অবাক হবেন শিল্পাঞ্চলের বাসিন্দারা। সূত্র মারফত জানা গেছে, কয়লা চুরি, জাল সংশয় পত্র দিয়ে ব্যবসা, অবৈধভাবে সরকারি খাস জমি দখল করে প্রোমোটারি, নির্বাচনী তহবিলের নামে তোলাবাজি সহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে লাইফ কেয়ার হাসপাতালের কর্মকর্তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে। আগামী পর্বে দুর্গাপুরের লাইফ কেয়ার হাসপাতাল ও তার মালিকদের বিরুদ্ধে আরো বিস্তারিত তথ্যসম্বলিত সংবাদ পরিবেশন করা হবে, যা জানার পর দুর্গাপুরের লাইফ কেয়ার হাসপাতাল সম্বন্ধে সম্পূর্ণ ধারণাটাই বদলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে শিল্পাঞ্চলের বাসিন্দাদের।


















