এই বাংলায় দক্ষিণ বাংলা দেশ ও বিদেশ

দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাবের অচল অবস্থা ও জমি বিভ্রাট এর অন্তরতদন্ত (পর্ব-৩)

By Eaibanglai - September 13, 2026
— Advertisement —
Advertisement
দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাবের অচল অবস্থা ও জমি বিভ্রাট এর অন্তরতদন্ত (পর্ব-৩)

মনোজ সিংহ, দুর্গাপুর:- গত ৬ সেপ্টেম্বর দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র সিটি সেন্টারে এক সাংবাদিক সম্মেলন করেন দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাবের একাধিক প্রাক্তন সভাপতি সহ দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাবের প্রাক্তন সদস্যরা। জানানো হয় আপাতত ক্লাবের সমস্ত কাজকর্ম 'স্ট্যাটাস কো' (যথা-অবস্থা বা স্থিতাবস্থা)-এর আওতাভুক্ত করা হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল লায়ন্স ক্লাবের পক্ষ থেকে। বিভিন্ন মহল থেকে জানার চেষ্টা করা হয় এই দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাবের অচল অবস্থার পেছনে মূল কারণ কি?

শিল্পাঞ্চলের সব থেকে ঐতিহ্যবাহী ও সমাজের প্রভাবশালী বিশিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, গুণীজন, বিশিষ্ট সমাজসেবী ও রাজ্য তথা কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা হলেন এই দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাবের সদস্য। দীর্ঘ রজতজয়ন্তী বর্ষ পার করেও সুনাম, ঐতিহ্য, গরিমা ও মানব সেবার এক অনন্য প্রতিষ্ঠান রূপে 'দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাব' শিল্পাঞ্চলের মানুষের কাছে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু "প্রদীপের তলায় কি ঘন অন্ধকার"?  

দীর্ঘ ৫০ বছরের সুনাম,ঐতিহ্য ও গৌরবময় পথ চলা কে কি কালিমা লিপ্ত হতে হচ্ছে জমি বিভ্রাটে। কিন্তু কেন? 

চ্যানেল এই বাংলায়' নিজ উদ্যোগে দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে বসবাসকারী একাধিক দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাবের প্রাক্তন সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করে এক অন্তরতদন্ত শুরু করে।  সেই অন্তর তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য যা এতদিন জনসমক্ষে তেমনভাবে তুলে ধরা হয়নি বলে বিভিন্ন মহলের অভিযোগ।

'চ্যানেল এই বাংলায়'এর অন্তরতদন্ত থেকে জানা যায়, ১৯৭৫ সালের ইন্টারন্যাশনাল লায়ন্স ক্লাবের কাছ থেকে অনুমোদন( চার্টার) পায় দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাব। সেই সময় কম বেশি নাকি প্রায় ৪২ জন সদস্য ছিলেন এই দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাবে। ইন্টারন্যাশনাল লায়ন্স ক্লাবের মত ঐতিহ্যবাহী ও বিখ্যাত সংগঠনের সদস্যপদ গ্রহণ করতে প্রতিবছরেই নাকি দিতে হয় সদস্যপদ নবীকরণের জন্য মোটা টাকা।

১৯৭৫ সালে দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাব প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে যথাসাধ্য মানবিক সেবা প্রধান করে এসেছে সু-নামের সাথে। কিন্তু হঠাৎই ১১/০৯/২০০০ সালে তখনকার কিছু সদস্যদেরকে নিয়ে নতুন করে একটি ট্রাস্ট তৈরি করা হয় এবং তার নাম দেওয়া হয় 'দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাব ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট'। এখান থেকেই শুরু হয় এক গভীর ষড়যন্ত্রের সূত্রপাত বলে অভিযোগ। সূত্র মারফত জানা গেছে তখন ওই ট্রাস্ট টির সদস্য সংখ্যা ছিল কমবেশি ৫০ জনের মতো ছিল। সবথেকে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো ওই ট্রাস্টর সরকারি নথিতে নাকি উল্লেখযোগ্য ভাবে লেখা হয়েছে যে এই ট্রাস্ট টি কোনভাবে Amended বা সংশোধিত করা যাবে না। দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাবের এখনো অবধি যে ১৪০ জনের কাছাকাছি সদস্য রয়েছেন তাদের কাছে নাকি দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাব ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টে স্থায়ী সদস্যপদ বা যোগদান করার কোন সুযোগ নেই বলে সূত্র মারফত জানা গেছে। প্রশ্ন উঠেছে তাহলে কি দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাবের সকল মেম্বারদের কে অন্ধকারে রেখে পুরনো যুগের জমিদারি প্রথা চলছে দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাব ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের আড়ালে ? সম্প্রতি বছর দুয়েক আগে কেনা একটি ১৫ কাঠা জমিকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে আসে  'দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাব' ও 'দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাব ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট' এর গন্ডগোল ও বিতর্কের মূল কারণের প্রতিচ্ছবি।

'চ্যানেল এই বাংলায়' এর অন্তরতদন্ত থেকে জানা যায়, ১৯৭৫ সালের ইন্টারন্যাশনাল লায়ন্স ক্লাবের কাছ থেকে অনুমোদন( চার্টার) পাবার পর দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাব, ৩১/৭/১৯৯০ সালে দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ৩৩(তেত্রিশ) বছরের জন্য ইস্পাত নগরীর ভেতরে একটি লিজ জমির অনুমোদন পায়। জমির পরিমাণ কমবেশি ০.২৫ একর মত ছিল বলে জানা যায়।

স্থানীয় সূত্র মারফত জানা গেছে যে জমির ওপরে বর্তমানে দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাবের ভবন বা মুখ্য কার্যালয়টি অবস্থিত রয়েছে সেই জমিটি নাকি দুর্গাপুর ইস্পাত কতৃপক্ষ জনৈক্য ভৌমিক অটো নামক কোন সংস্থাকে দিয়েছিলেন।  এবং দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাব কে দেওয়া জমিটি নাকি ছিল সেখান থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে বেনাচিতি পাঁচমাথা মোড় সংলগ্ন পেট্রোল পাম্পের পেছনের দিকে বলে জানা গেছে।  যদিও দুর্গাপুর ইস্পাত কর্তৃপক্ষের টাউন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ বিল্ডিংয়ের উচ্চ আধিকারিকরা এ বিষয়ে তদন্ত করে দেখার প্রয়োজন টুকুও মনে করেননি বলে অভিযোগ।

গত ৩০/০৭/২০২৩ সালে দুর্গাপুর ইস্পাত কর্তৃপক্ষ দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাব পরিচালন কমিটির কাছে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেন যে ৩৩ বৎসর লিজের মেয়াদকাল অতিক্রমের পর তাদেরকে আবার নতুন করে নবীনকরণ করাতে হবে। দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানা তেত্রিশ বছরের লিজ দেওয়া জমির বর্তমান জমির দর যাচাই করে নাকি একটি মোটা অংকের টাকা, ফি হিসেবে জমা দিতে জানিয়ে ছিলেন দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাব কর্তৃপক্ষকে বলে সূত্র মারফত জানা গেছে। কিন্তু জানা গেছে, দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাব পরিচালন সমিতি এখনো পর্যন্ত দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানা কর্তৃপক্ষকে জমি বাবদ নতুন করে নবিনিকরণ করার জন্য কোন টাকা বা তথ্য দেয়নি। অর্থাৎ এক কথায় বলতে গেলে দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার দেওয়া যে জমিতে দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাব ও তার ভবন সহ হাসপাতাল বিরাজমান, সেই জায়গার কোন বৈধ নথি আপাতত দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাব কর্তৃপক্ষের কাছে নেই বলে জানা গেছে। ইস্পাত নগরীর প্রাণ কেন্দ্র বেনাচিতির মতন একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাবের বিশাল চক্ষু হাসপাতাল কিভাবে চলছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে? শুধু তাই নয় সূত্র মারফত এও জানা গেছে উক্ত ওই বিশাল চক্ষু হাসপাতাল নাকি চলছে সম্পূর্ণ ফায়ার লাইসেন্স বিহীন। ওই চক্ষু হাসপাতালে এখনো পর্যন্ত কোনো স্থায়ী ফায়ার লাইসেন্স নেই বলে জানা গেছে। 

'চ্যানেল এই বাংলায়' এর অন্তরতদন্ত থেকে জানা যায়, দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাবের ভবন সহ চক্ষু হাসপাতালের জন্য নাকি দুটি নতুন ইলেকট্রিক মিটার নেওয়া হয়েছিল মাত্র বছর দুয়েক আগে। একটি ইলেকট্রিক মিটার দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাবের নামে ও অন্যটি দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাব ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের নামে। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে যদি মাত্র দু বছর আগে নতুন ইলেকট্রিক মিটার নেওয়া হয়েছে, এই দুই সংগঠনের পক্ষ থেকে তাহলে তার আগে (৫০)পঞ্চাশ বছর ধরে বিদ্যুতের বিল বাবদ টাকা নেওয়া হচ্ছিল কিভাবে দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানা কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে? দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাবের ভবন ও চক্ষু হাসপাতালে কমবেশি প্রায় (২০)কুড়িটি বাতানুকূল যন্ত্র অর্থাৎ এয়ারকন্ডিশন মেশিন চলে বলে জানা গেছে। দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানা কর্তৃপক্ষ নাকি শুধুমাত্র দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাবের ভবন ও চক্ষু হাসপাতালের জন্য নাকি একটি আলাদা ট্রান্সফরমারের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন বছর দুয়েক আগে।

অন্যদিকে বছর দুয়েক আগে দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাব পরিচালন সমিতির কয়েকজন মুখ্য সদস্য নাকি একটি আবাসিক বৃদ্ধাশ্রম করার জন্য প্রায় ৫২ লক্ষ টাকা খরচা করে ১৫ কাটা জমি কেনেন দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল লাগুয়া এলাকায়। উক্ত ঐ জমিটি সরাসরি দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাবের নামে মিউটেশন করানো হয়, দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাব ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের নামে নয়। কিছু সদস্যের অভিযোগ তারপর থেকেই গন্ডগোল বাদে দুই সংস্থার সদস্যদের মধ্যে। একটি পক্ষের অভিযোগ নিম্নমানের জমি উচ্চ দরে কেনা হয়েছে। 

অপরদিকে অন্য পক্ষের অভিযোগ জ্মিটি ক্লাবের টাকায় কেনা তাই দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাবের নামে মিউটেশন করা হয়েছে। প্রয়োজনে জমি বিক্রি করে টাকা আবার দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাবের তহবিলে চলে আসতে পারে। কিন্তু যদি দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাব ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের নামে জমি কেনা হত তাহলে আর কোনদিনই দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাবের নামে নাকি ওই জমি হত না বলে অভিযোগ তোলেন। কিছু ব্যক্তিদের নাকি নিজস্ব মালিকাধীন ট্রাস্টের নামে জমি না করার ফলে তাদেরই একাংশ অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। 

অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের মধ্যে একটি চিত্র পরিষ্কার হয়ে আসছে যে দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাব ও দুর্গাপুর লায়ন্স ক্লাব ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের কাজ-কর্মের খুঁটিনাটি সরকারি গোয়েন্দা পর্যায়ে তদন্ত করে দেখার অবকাশ রয়েছে। মেয়াদ উত্তীর্ণ জায়গায় ক্লাব ভবন ও চক্ষু হাসপাতাল। চক্ষু হাসপাতালে নেই বৈধ ফায়ার লাইসেন্স। চক্ষু হাসপাতাল পরিচালনা করে ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট। বিদ্যুতের বকায়া বিল প্রদান করা হয় ট্রাস্ট এর পক্ষ থেকে। আরো কত কি না রহস্য জমে রয়েছে এই দুই সংগঠনের অন্তরে। তাই দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের বিত্তশালী ও উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের এই ক্লাব ও ট্রাস্ট এর বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগের যথাযথ আইনি পর্যায়ে তদন্তের দাবি তুলেছেন শিল্পাঞ্চলের মানুষজন।

চলবে....................

— Advertisement —
Advertisement
— Advertisement —
Advertisement
— Advertisement —
Advertisement
— Advertisement —
Advertisement
— Advertisement —
Advertisement
— Advertisement —
Advertisement
— Advertisement —
Advertisement
— Advertisement —
Advertisement
— Advertisement —
Advertisement