মনোজ সিংহ, দুর্গাপুরঃ- মাত্র দু মাস আগেই রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে ভারতীয় জনতা পার্টির সরকার। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শক্ত হাতে প্রশাসন পরিচালনা করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। দুর্নীতি, তোলাবাজি, কাঠমানি, দাদাগিরির ও সন্ত্রাসবাদী কাজের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়ে, সমস্ত রাজ্য সরকারের আওতাধীন বিভাগ গুলিকে সচেতন হওয়ার বার্তা দিয়েছেন। রাজ্যের পৌর ও নগর উন্নয়ন বিভাগে আসানসোল থেকে নির্বাচিত শ্রীমতি অগ্নিমিত্রা পাল পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব সামলে, দপ্তরের সকল ফেলে রাখা কাজগুলির দ্রুততার সাথে তদারকি করে ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন। সরকার দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স নীতিতে চলছে। সরকারের কড়া মনোভাবের পরও এখনও বেশ কিছু রাজ্য সরকারের আধিকারিক পুরোদস্তুর দুর্নীতির বাজার গরম করে চলেছেন বলে অভিযোগ। শিল্পাঞ্চল দুর্গাপুরের প্রাণকেন্দ্র সিটি সেন্টারে অবস্থিত দুর্গাপুর পৌর নিগমের অফিসে এখনও বাস্ত ঘুঘুর আড্ডা বলে অভিযোগ।
উল্লেখ্য কয়েকদিন আগে দুর্গাপুরের বাসিন্দা শিবকুমার মণ্ডল ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ ঘিরে বিতর্কের পর, গত শুক্রবার পুর কমিশনারের আবুল কালাম আজাদ ইসলামের স্বাক্ষরিত নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে, অভিযুক্ত কর্মী স্বপ্নেন্দু ভৌমিক (ওরফে জয়)-কে বর্তমান ক্যাশ সেকশন থেকে বদলি করে ৪ নম্বর বরোর অধীন বীরভানপুর শ্মশানে পাঠানো হয়েছে। অতীতেও স্বপ্নেন্দু ভৌমিকের আচরণ নিয়ে একাধিকবার প্রশ্ন উঠেছিল। সাম্প্রতিক এই ঘটনার পর ফের বিতর্ক তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত পুরসভা স্বপ্নেন্দুকে বীরভানপুর শ্মশানে বদলি করে দিল।
https://www.facebook.com/share/v/19KKEpGYwj/
অন্যদিকে অবাক করার মতন কাণ্ড হল ওই পুর কমিশনারের স্বাক্ষরিত নির্দেশিকাকে কেন্দ্র করে। নির্দেশিকাটিতে পরিষ্কারভাবে জানানো হয়েছে বীরবাহানপুর মহাশ্মশানে কর্মরত বাবলু বিশিকে পুনরায় দুর্গাপুর নগর নিগমের ক্যাশ সেকশনে (মেন ক্যাশ কাউন্টার) এ বদলি করা হল। শিল্পাঞ্চল দুর্গাপুরে কান পাতলেই শোনা যায় এই বাবলু বিশির একাধিক দুর্নীতির গল্প। এই বাবলু বিশির ও তার ভাই প্রসূন বিশির বিরুদ্ধে পৌরসভার তেল চুরি করার অভিযোগ উঠেছিল। দুর্গাপুর পৌরসভার অন্তরে শোনা যায়, দুই ভাই প্রসুন ও বাবলু মিলে দুর্গাপুর পৌরসভায় কার্যত লুট চালাচ্ছিলেন। এই ঘটনার জানাজানি হতেই গত বিধানসভা নির্বাচন বিধি প্রত্যাহার হতেই পৌর কর্তৃপক্ষ পৌরসভার অস্থায়ী কর্মী প্রসুনকে পৌরসভাতে আসতে নিষেধ করে দেয়। একই সঙ্গে বাবলু বিশিকে বীরবাহানপুর শ্মশানে বদলি করা হয়। রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদল হতেই দুর্গাপুর পৌরসভার দুর্নীতি একে একে প্রকাশ্যে আসতে শুরু হয়। কয়েকদিনের ভেতরেই পরিষ্কার হয়ে যায় এখানে 'পুকুর' নয় গোটা একটা 'সমুদ্র' চুরি হয়ে গিয়েছে বলে একাধিক পুরসভা কর্মীদের অভিযোগ।
দুর্গাপুর পৌর নিগমের দুর্নীতির অন্যতম মুখ হিসেবে বাবলুকে চিহ্নিত করে শিল্পাঞ্চলের বাসিন্দারা ও পুরসভা কর্মীরা। তারা অভিযোগ করেন, যখন বাবলু বিল্ডিং প্ল্যান বিভাগে কর্মরত ছিলেন, সেই সময় নাকি তার বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে অবৈধভাবে বহু বিল্ডিং এর প্ল্যান পাস করানোর অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগের গুরুত্ব এতটাই ছিল যে একসময় তাকে ওই বিভাগ থেকে ক্যাশ বিভাগে সরিয়ে দেওয়া হয়। এবারের বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনার দিন দুর্গাপুর পৌর নিগমের বিল্ডিং প্ল্যানিং বিভাগ থেকে ১৪ টি অত্যন্ত জরুরি ফাইল সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি গোপন ফাইল লোপাটের অভিযোগও ওঠে এই বাবলুর বিরুদ্ধে।

গত ২৪/৭/২০২৬ তারিখে দুর্গাপুর নগর নিগমের কমিশনার আবুল কালাম আজাদ ইসলামের স্বাক্ষরিত একটি নির্দেশ নামায় বাবলু বিশিকে বীরবাহনপুর শ্মশান থেকে দুর্গাপুর নগর নিগমের ক্যাশ সেকশন (মেন ক্যাশ কাউন্টার) এ বদলি করা হয়। নির্দেশ নামা হাতে পেতেই বাবলু সোজা এসে ক্যাশ সেকশনের 'বড়বাবু' সেজে চেয়ারে বসে আবার তার স্বমহিমায় কর্মকাণ্ড শুরু করে দেন বলে অভিযোগ। সব থেকে আশ্চর্য করার বিষয় হলো সরকারি নির্দেশ নামায় পরিষ্কারভাবে তার নামের পসে 'এল ডি এ অর্থাৎ লোয়ার ডিভিশন অ্যাসিস্ট্যান্ট' উল্লেখ থাকলেও বাবলু সোজা গিয়ে বসেন ক্যাশ সেকশনের মেন চেয়ারে আশ্চর্যজনক ভাবে। কয়েকদিন আগেই এই ক্যাশ সেকশনের কর্মী স্বপ্নেন্দু ভৌমিক যিনি কিনা 'ইউ ডি এ অর্থাৎ আপার ডিভিশন অ্যাসিস্ট্যান্ট' ওই ক্যাশ সেকশনের চেয়ার সামলে ছিলেন, তাকে বদলি করা হয়েছে বীরবাহানপুর শ্মশানে। বাবলু কে দুর্গাপুর পৌর নিগমের মেন ক্যাশ সেকশন এর চেয়ারে বসতে দেখে অবাক হয়ে যান ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন পৌরসভায় কর্মরত একাধিক কর্মী। পৌরসভায় কর্মরত কর্মীরা আক্ষেপ করে অভিযোগ করেন, "একজন 'আপার ডিভিশন অ্যাসিস্ট্যান্ট' এর চেয়ারে কিভাবে একজন 'লোহার ডিভিশন অ্যাসিস্ট্যান্ট' বসতে পারেন। তাদের অভিযোগ দুর্গাপুর নগর নিগমের কমিশনারের নির্দেশ নামায় বাবলুকে ক্যাশ সেকশন ( মেন ক্যাশ কাউন্টার ) লেখা থাকলেও সুকৌশলে বাবলু সোজা গিয়ে বসেন ক্যাশ সেকশন এর মেন ক্যাশ চেয়ারে।"

এ বিষয়ে দুর্গাপুর নগর নিগমের কমিশনার আবুল কালাম আজাদ ইসলামকে প্রশ্ন করা হলে তিনি রাজ্য সরকারের গাইডলাইন অনুযায়ী বক্তব্য দেওয়ার অধিকার নেই জানিয়ে উপস্থিত সাংবাদিককে দুর্গাপুর নগর নিগমের দায়িত্বে থাকা মাননীয় জেলাশাসককে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে অনুরোধ করেন।

অন্যদিকে যার অভিযোগে মূলত বাবলু কে বদলি করা হয়েছিল বীরবাহোনপুর শ্মশানে। সেই দুর্গাপুর পশ্চিমের বিধায়ক লক্ষণ ঘড়ুই এদিন জানান, "বাবলুর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ ছিল আমার কাছে, তাই আমি জেলাশাসক ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অভিযোগ জানিয়েছিলাম। আমার অভিযোগের ভিত্তিতে বাবলু কে বীরবাহানপুর শ্মশানে বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু এখন জানতে পারছি বাবলু কে আবার নগর নিগমের ক্যাশ সেকশনে বদলি করা হয়েছে। আমাদের সরকার দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স নীতিতে চলছে। তাই বাবলুর গতিবিধির ওপর সতর্ক নজরদারি রাখা হচ্ছে বলে আমি জানতে পেরেছি। যদিও বাবলুর এই পুনরায় দুর্গাপুর নগর নিগমের ক্যাশ সেকশনে বদলির বিষয়টি রাজ্য সরকারের আওতাধীন, তাই আমরা এ বিষয়ে জেলা শাসকের মতামতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। তবে বাবলুর বিরুদ্ধে 'লোয়ার ডিভিশন অ্যাসিস্ট্যান্ট' হয়ে পৌরসভার ক্যাশ সেকশনের 'আপার ডিভিশন অ্যাসিস্ট্যান্ট' এর চেয়ারে বসার ব্যাপারটিতে আমি আশ্চর্য। এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত খোঁজখবর ও তদন্ত করে দেখব।"

এদিকে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চলের বাসিন্দারা ও পৌরসভায় কর্মরত কর্মীরা বলতে শুরু করেছেন বাবলু বোধাই 'ওয়াশিং মেশিনে' ধুয়ে সাফ হয়ে গিয়েছে। তাই হাজারও অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বাবলুর 'ডোন্ট কেয়ার' মনোভাব এখনও অব্যাহত। 'সত্যিই কি বিচিত্র এই দেশ ও দেশের রাজনীতি'।