নিজস্ব সংবাদদাতা,দুর্গাপুরঃ- একসময় দু’মুঠো অন্নের জন্য কেউ ভাঙারি কুড়িয়েছেন, কেউ প্লাস্টিক-শিশি বোতল সংগ্রহ করে বিক্রি করেছেন, কেউ রাস্তার ধারে পড়ে থাকা কয়লা কুড়িয়ে সংসার চালিয়েছেন। কেউ গ্যারেজ থেকে অল্প অল্প করে সংগ্রহ করা পুরনো মবিল বা ডিজেল বিক্রি করেছেন, কেউ ছোটখাটো ব্যবসা, হকারি, পরিবহণ, নির্মাণ শ্রম বা দৈনিক মজুরির কাজ করে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন। শিক্ষিত বহু বেকার যুবকরা বাইকের সামনে প্রেস লিখে সংবাদ মাধ্যমে কাজ করছেন, সামান্য আয়ের জন্য। এইসব পথই ছিল হাজার হাজার মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন। কিন্তু সময় বদলেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ কমে যাওয়া, প্রশাসনিক পরিবর্তন, নতুন নিয়ম-কানুন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি শ্লথ হয়ে পড়ায় আজ সেই মানুষগুলোর বড় অংশ চরম আর্থিক সংকটে।
অনেকের অভিযোগ, আগে যেখানে প্রতিদিন কিছু না কিছু রোজগারের সুযোগ ছিল, এখন দিনের পর দিন কাজ মিলছে না। ফলে সংসারে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তার কালো ছায়া। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি, বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসার খরচ, সব মিলিয়ে বহু পরিবার আজ দিশেহারা। একসময় যে মানুষ নিজের পরিশ্রমে সম্মানের সঙ্গে সংসার চালাতেন, আজ তিনি ধার-দেনা করে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।
এক শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠে ফুটে উঠল অসহায়তার আর্তি, আমরা ভাতা চাই না, চাই কাজ। নিজের ঘাম ঝরিয়ে পরিবারের মুখে দু’মুঠো ভাত তুলে দিতে চাই। কিন্তু কাজই যদি না থাকে, তাহলে বাঁচব কীভাবে?
স্থানীয়দের দাবি, সমাজের নিচুতলার এই মানুষগুলোই সবচেয়ে বেশি বিপদের মুখে। কেউ সামান্য রোজগার থেকে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থার উন্নতি করেছিলেন। আবার কেউ প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভর করেই কোনোরকমে সংসার চালাতেন। এখন সেই আয়ের পথ সংকুচিত হওয়ায় অনেক পরিবার কার্যত নিঃস্ব হওয়ার পথে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান কমে গেলে তার সবচেয়ে বড় আঘাত আসে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর। নিয়মিত আয়ের পথ বন্ধ হলে ঋণের বোঝা বাড়ে, ছোট ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে এবং তার প্রভাব স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়ে।
এদিকে সরকার শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার কথা জানিয়ে আসছে। তবে তা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, এই উদ্যোগের বাস্তব সুফল কবে তাঁদের ঘরে পৌঁছাবে?
এলাকার অনেকের অভিযোগ, ভোটের সময় কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি শোনা গেলেও ভোট মিটে গেলে সাধারণ মানুষের অভাব-অনটনের কথা আর তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। তাঁদের কথায়, “রাজনীতি নয়, এখন আমাদের দরকার কাজ। কারণ কাজ থাকলে মানুষ মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে।”
আজ দুর্গাপুর-সহ শিল্পাঞ্চলের অসংখ্য পরিবারের একটাই আর্তি, দয়া নয়, ভাতা নয়, চাই সম্মানের সঙ্গে বাঁচার মতো কাজ। কারণ রোজগারের পথ যত সংকুচিত হবে, ততই বহু পরিবারের জীবনে অভাব, অনিশ্চয়তা আর হতাশার অন্ধকার আরও ঘনীভূত হবে।

















