সংবাদদাতা,পুরুলিয়াঃ- স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর শিষ্যকে বলেছিলেন, “জন্মেছিস যখন, একটা দাগ রেখে যা।” মানুষ তাঁর কত মহান কর্মের মাধ্যমে নিজের দাগ রেখে যায়। কিন্তু পুরুলিয়ার রঘুনাথপুরের চা ও চপ বিক্রেতা ভোন্দুদা স্মরনীয় হয়ে রইলেন তাঁর কর্মনিষ্ঠা ও আন্তরিক ব্যবহারের জন্য। তিনি শুধু মানুষের হৃদয়েই দাগ রেখে যাননি, তাঁর জীবদ্দশাতেই জনপ্রিয়তার কারণে তাঁর নামেই এলাকার পরিচিতি তৈরি হয়। এমনকি পরে তাতে খোদ সরকারি শিলমোহর পড়ে। রঘুনাথপুরের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের নামকরণ হয় ‘ভোন্দুর মোড়’। পূর্ত দফতর থেকে ‘ভোন্দুর মোড়’ লেখা বোর্ড বসানো হয় এলাকায়। জীবিত অবস্থায় রাস্তার নামকরণ! এরকম ঘটনা ভূ-ভারত কেন সারা বিশ্বে বিরল।
স্থানীয়রা জানান রঘুনাথপুরের ‘ভোন্দুর মোড়’ এলাকাটিতে জনবসতি গড়ে ওঠার আগে থেকেই ভন্দুদা ওরফে দুর্গাদাস করের বাবার চায়ের দোকান ছিল। সময়টা পঞ্চাশের দশক। এলাকায় জনবসতি না থাকলেও একটি গুদাম ছিল, সেখানে কর্মরত শ্রমিকরাই মূলত চায়ের দোকানের ক্রেতা ছিলেন। পরে ষাটের দশকের শুরুতে বাবার হাত ধরেই চায়ের দোকানে প্রবেশ ভোন্দুদার। সেই সময় এলাকায় জনবসতি না থাকায় আশেপাশের এলাকার জন্য ভোন্দুদার চায়ের দোকানই ছিল ল্যান্ড মার্ক। পরে এলাকায় গড়ে ওঠে ঘরবাড়ি দোকান পাট এবং এলাকাটির পরিচিতি গড়ে ওঠে ‘ভোন্দুর মোড়’ হিসেবে।
সম্প্রতি রঘুনাথপুর সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে ৮১ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ভোন্দুদা ওরফে দুর্গাদাস কর। তাঁর প্রয়াণে শোকের ছায়া নামে রঘুনাথপুর এলাকা জুড়ে। প্রয়াত এই জনপ্রিয় মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বৃহস্পতিবার রঘুনাথপুর ভোন্দুর মোড় দোকানদার কমিটির উদ্যোগে একটি স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয় এবং তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে বিকেল ৬টা পর্যন্ত মোড়ের সমস্ত দোকানপাট বন্ধ রাখা হয়।
ভোন্দুদার চায়ের দোকানের আশে পাশে গড়ে উঠেছে কত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠা, দোকান পাট, তবে নিজের ওই ছোট দোকনেই প্রায় ষাট পয়ষট্টি বছর ধরে একইভাবে নিষ্ঠার সঙ্গে নিজের কাজ করে গেছেন ভোন্দুদা। চা, চপ, মুড়ির পাশাপাশি তাঁর আন্তরিক ব্যবহার মানুষের মনে দাগ কেটে গেছে। সাধারণ জীবনযাপন, সততা এবং মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসাই ভোন্দুদাকে অসাধারণ করে তুলেছে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত ছিলেন।
স্থানীয়দের মতে এরকম একজন মানবদরদী ও কর্মনিষ্ঠ মানুষের জীবন অন্যদের কাছে একটা অনুপ্রেরণা। তাঁরা শুধু একজন চপ বিক্রেতাকে নয় বরং আপনজনকেই হারিয়েছেন।



















