মনোজ সিংহ, দুর্গাপুর:- পালিয়ে বেঁচেও লাভ বিশেষ হলো না। ‘চাটাই মাস্টার’ রমণীরঞ্জন রমা শেষ পর্যন্ত জমাই পড়ে গেলেন পুলিশের ফাঁদে। আর হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন বেনাচিতি,কুরুলিয়া ডাঙ্গাল, ভিরিঙ্গি, ৫৪ ফুট সহ ইস্পাত নগরীর একাংশের যুবতী ও গৃহবধূরা।
শ্রীনগর পল্লীর ‘চাটাই মাস্টার’ রমা হালদার ভিরিঙ্গির প্রভাবশালী মুখার্জি পরিবারকে পটিয়ে দুর্গাপুর পৌরসভার কাউন্সিলর হয়ে গেলেন ২০১৭ তে। জোরজবরদস্তির ওই ভোটে জেতার পর আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হল রমার। ধরা কে সরা জ্ঞান করা রমা প্রোমোটারি, দালালি, লোকের পরিবারে ঢুকে পঞ্চায়েতির পাশাপাশি মাস্টারি ভুলে অল্পদিনেই অন্য চাটাই পাতার হেডমাস্টার হয়ে গেলেন এর তার বউ টানাটানি করে, বলে এলাকায় কান পাতলেই শোনা যায়। তার বাসস্থানের অল্প দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক মাঝবয়সি গৃহবধূ বুধবার সকালে বলেন, “ও একটা মাতাল লম্পট। গত ৫-৭ বছরে ওর এত বাড় বেড়েছিল যে কাউকেই ছাড়ছিল না। দেখতে শুনতে ভাল হলেই শহরের মেয়েরা ওর কুনজরে পড়ে যেত।” ইস্পাত নগরীর আইনস্টাইন এভিনিউয়ের বাসিন্দা এক গৃহবধূ রাখি চ্যাটার্জির মতে সিটি সেন্টারের কল্পিতা নামের এক মেয়ের দালালের পাল্লায় পড়ে রমার নোংরামি চরম বেড়ে যায়। ওই দালাল নয়তো বা রমা মাস্টারের চ্যালা চামুণ্ডারা এখানকার মেয়ে বউদের টাকার লোভ দেখিয়ে বা জোর করেই খারাপ পথে যেতে বাধ্য করে। কল্পিতার আড়ালে শুরু হয় রমার আলাদা রকম চাটাই ব্যবসা। সাথে চলে দেদার ভোগ বিলাসও।”
তার এলাকা ২০(কুড়ি)নম্বর ওয়ার্ডের ৫৪ ফুটে রমা নাকি ইংরেজির দিকপাল বলে পরিচিত। প্রাইভেট টিউশনিটাই রমার প্রথম চাটাই ব্যবসা। ৫৪ ফুট এলাকাতে এক হাইডেনের ওপর চাটাই পেতে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াতে দেখা গিয়েছে রমাকে বেশ কয়েক বছর আগেও। অজস্র ছাত্রছাত্রী ও ছিল নাকি। সপরিবারে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে এসে বাঁকুড়া জেলার সোনামুখীতে সরকারি অনুদানে বসবাস করার সুযোগ পেয়েছিল এই রমা ও তার পরিবার, বলে সূত্র মারফত জানা গেছে। বছর ২০ আগে শিল্পাঞ্চলের ফাটা পাইপ শ্রীনগর পল্লী এলাকায় হাইড্রেনের পাশে বাঁশটালির ঝুপড়ি ঘরে বসবাস শুরু করে এখনকার এই রমা বলে জানা গেছে। শুরু হয় ইংরেজি মাস্টারির নাম করে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ানো। কিন্তু জানা যায় তখন থেকেই তার খারাপ চরিত্রের আঁচ পেতে শুরু করে কিছু ছাত্রী। তবে তৃণমূল সরকারে আসার পর নেতাদের সাথে তার অতি ঘনিষ্ঠতার সুবাদে রমার ব্যাপারে কেউ আর মুখ খোলার সাহস পেত না। তাতেই আরো লাগামছাড়া হয়ে যায় রমা। অতিরিক্ত রমনী পিপাসার জন্যই তার নাম হয়ে যায় ‘রমণীরঞ্জন রমা’।

দুর্গাপুর ইস্পাতের পিপলস কোঅপারেটিভ ব্যাংকের এক আধিকারিক এর বউকে টানাটানি শুরু করে শেষ পর্যন্ত তাকে ভাগিয়ে নিয়ে কুরুলিয়া ডাঙ্গালের আলাদা করে গাই বাছুর সমেত সংসার পাতেন বিবাহিত রমা।
বারবার নতুন নতুন জমিতে হাল চালানোর বরাবরই নেশা রমা হালদারের। দুর্গাপুর ইস্পাত নগরীর আইনস্টাইন এভিনিউয়ের সেই পিপলস কো-অপারেটিভ ব্যাংকের আধিকারিকের বউ ‘রুবি’কে নিয়ে রমা যখন লম্বা হানিমুনে তখন এদিকে দুঃখে, যন্ত্রণায় আত্মঘাতী হন ব্যাংকের ওই আধিকারিক। ইস্পাত নগরীর আইনস্টাইন এভিনিউ এর প্রায় সবারই একথা জানা আছে। কিন্তু সব তদন্ত ধামাচাপা পড়ে দিন দিন রমণীরঞ্জন রমার প্রভাব বাড়ার ফলে।
রমার প্রভাব রকেটের গতিতে বাড়তে শুরু করে তৃণমূলের তোষামোদখোর নেতাদের দয়ায়। তার নতুন বউয়ের আত্মঘাতী স্বামীর সেই ব্যাংকেই সর্বে সর্বার পদে অভিষেকের পর। তার আরো পাখনা গজায় শহরের দুই ধূর্ত ‘দত্তর’ গর্তে ঢুকে দেদার গুরুত্ব পাওয়ার পর। এলাকার প্রায় সব প্রোমোটার, ঠিকাদার, ব্যবসায়ীদের এবার হাতে মাথা কাটা শুরু করে কোটি কোটি টাকা কামাই করে ৫৪ ফুটের ডন হয়ে ওঠে রমা, বলে বিজেপির একটি পদস্থ সূত্রের দাবি। সূত্রটি আরো বক্তব্য “এই সব রমা-ভিমারা তো দুর্গাপুরের দুই দত্তের পোষ্যপুত্র হয়ে যুবরাজ হয়ে উঠেছে। একে একে এদের সব হিসাব হবে।” বিজেপির এক মন্ডল নেতার কথায় “এরকম কম করে ১৫ জন রয়েছে। পেঁয়াজের মত একে একে এদের খোসা ছাড়ানোর পর মাথাটা ধরে টান দেবে আমজনতা। সব হিসাব বরাবর করা হবে এইভাবেই।”
বুধবার রমাকে আদালতে হাজির করানোর সময় জড়ো হওয়া বিক্ষুব্ধ জনতা মুক্তির খুশিতে ঘনঘন চোর চোর স্লোগান দিতে শুরু করেন রমাকে দেখে। রমাকে জনরোষ থেকে বাঁচাতে প্রচুর পুলিশের পাশাপাশি মতায়ন করা হয় কেন্দ্রীয় বাহিনীকেও। আর তা নিয়ে প্রশ্নও ওঠে। কারণ গত সপ্তাহে আরেক প্রাক্তন কাউন্সিলর রাজীব ঘোষকে আদালতে পেশ করার সময় তো এত অঁটোসাটো ব্যবস্থা করা ছিল না? তাহলে কি সব বলে কয়ে সেটিং করেই রমাকে এমন আদরের এরেস্ট করা হল? আদালতে ভিড় করা কয়েকজন বিক্ষুব্ধ মহিলা বিজেপি নেতাও কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের সামনে চিৎকার করে বলতে থাকেন, “রমা প্রসাদের চামড়া/তুলে নেব আমরা।”
রমার প্রতিবেশী বিক্ষুব্ধ এক যুবক প্রলয় নন্দী এদিন আদালতে এলাকাবাসীর সাথে এসেছিলেন। তিনি বলেন, “চরিত্রহীন রমা হালদার দিনে থাকে ২০(কুড়ি)নম্বর ওয়ার্ডে আর রাত্রে থাকে ১১ নম্বর ওয়ার্ডের কুরুলিয়া ডাঙ্গায়। একজন টিউশিনি মাস্টার পাঁচ ছয় বছরে কি করে ২০০ কোটি টাকার মালিক হল তা এলাকার মানুষ জানতে চায়।” তার কথায়, “বিভিন্ন এলাকায় হয় সরকারি জমি বা অন্যের জমি দখল করে রমা অগুন্তী বেআইনি ফ্ল্যাট বিল্ডিং তুলেছে। এই ভাবেই ২০০ কোটি টাকা কামিয়ে হাজারো রকম ব্যবসা ফেঁদেছে। ওর ৬০টি গাড়ি শুধু কোলিয়ারিতেই চলে। এছাড়াও কম করে দু ডজন মাটি কাটার পোকলেনও কিনেছে। কি করে সম্ভব হল মানুষ এবার জবাব চায়।” তিনি আরো বলেন, “অবিলম্বে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনী ইডি, সিবিআই ও ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্টকে দিয়ে এই রমা ও তার সাগরেদদের তদন্ত করানো উচিত বা করাতে হবে।”
“রমা একজন মাফিয়া ডন চার চারটে বিয়ে ওর। আমাদের এলাকায় শুধু জমি বাড়ি নয়, মেয়েদেরকেও যথেষ্ট লুট করেছে ও। আর ওর এসব কাজে এমনকি তৃণমূলের মেয়েদেরকেও ছাড়েনি এ। সোমা,মুনমুন, পূর্ণিমা, লক্ষ্মী এসব মেয়েদেরকে ও যথেচ্ছ ব্যবহার করেছে তা সবাই জানে। আমরা আজ এখানে এসেছি শুধু ওর মুখটা দেখব বলে,” বলেন আদালত চত্বরে আসা শিবানী গোস্বামী। তিনি আরো বলেন, “অনেককে কাঁদিয়েছে, এবার ওকে ছাড়ার নাই। পুলিশ বলল ওকে আমাদের পাড়ায় কোমরে দড়ি পড়িয়ে ঘোরাবে। কিন্তু করলো না। এখানেও কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে আড়াল করে ঢুকিয়ে দিল আদালতের লকআপে। আমরা জানতে চাই পুলিশ এমন কেন করল। তাহলে কি নেতা ওপুলিশের সাথে রমার সেটিং হয়ে গিয়েছে?”
অন্যদিকে শিল্পাঞ্চলের সাধারণ বাসিন্দারা পুলিশ ও নেতাদের আচরণ দেখে প্রশ্ন তুলেছেন ‘ওয়াশিং মেশিনে’ ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গিয়েছে রমা?



















