নিজস্ব সংবাদদাতা, দুর্গাপুরঃ- প্রতি বছর ৫ই(পাঁচ) জুন পরিবেশ দিবসে মঞ্চ সাজে, বক্তৃতা হয়, গাছ লাগানো হয়। কিন্তু মঞ্চের আড়ালে দুর্গাপুরের বুকে চলছে এক নীরব পরিবেশ-হত্যাযজ্ঞ। সরকারি সংস্থা অ্যাসানসোল দুর্গাপুর ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (ADDA) এবং দুর্গাপুর মিউনিসিপাল কর্পোরেশন (DMC) এবং আসানসোল মিউনিসিপাল কর্পোরেশন (AMC)-এর মদতে ও নীরব সম্মতিতে পশ্চিম বর্ধমান জেলার রেকর্ডেড বন জমিগুলি একের পর এক হস্তান্তরিত হচ্ছে শিল্পপতি ও আবাসন ব্যবসায়ীদের হাতে। বন বিভাগের ছাড়পত্র নেই, আদালতের নির্দেশ উপেক্ষিত, আর প্রশাসন বসে আছে নির্বিকার।
পশ্চিম বর্ধমান জেলা ভারতের অন্যতম প্রধান শিল্পতালুক, কয়লা, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, বিদ্যুৎ এর। কিন্তু এই শিল্পায়নের আড়ালে যা ঘটছে তা রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। তথ্য অধিকার আবেদন ও প্রশাসনিক নথির ভিত্তিতে জানা গেছে, এই জেলায় রাজস্ব রেকর্ডে “জঙ্গল” শ্রেণীভুক্ত ৩,২৬৮ বিঘারেরও বেশি বন জমি আজ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার কবলে। শ্রেণী পরিবর্তন নেই, বন বিভাগের ছাড়পত্র নেই, কেন্দ্রীয় অনুমতি নেই -শুধু আছে দখল আর নীরবতা। এই তালিকায় রয়েছে ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেড (ECL), ভারত অ্যালুমিনিয়াম কোম্পানি (BALCO)-সহ আরও একাধিক সরকারি ও বেসরকারি শিল্প সংস্থা। ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেড, ECL-এর ভূমিকা সব থেকে বেশি দুর্ভাগ্যজনক। বিঘার পর বিঘা বন জমি দখলে রেখেছে, কিন্তু সেখানে না আছে কয়লা উত্তোলন, না আছে বনায়ন। জমি পড়ে আছে গাছশূন্য, প্রাণশূন্য। শুধু বন বিভাগের অধিকার চিরতরে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। উন্নয়নের নামে এই যে বনভূমি হত্যা চলছে, তার বিচার কে করবে?
দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের এক সমাজকর্মী ও আর টি আই অ্যাক্টিভিস্ট, সুব্রত মল্লিক, ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর (Grievance No. SSM5388270) অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে জানানো হয়, দুর্গাপুর মিউনিসিপাল কর্পোরেশন, ওয়ার্ড নম্বর ২৭-এর অন্তর্গত গোপীনাথপুর মৌজার R.S. Plot No. 2493 ও 214/2493-এ- যা বাংলার ভূমি পোর্টাল অনুযায়ী অ্যাসানসোল দুর্গাপুর ডেভেলপমেন্ট অথরিটি ADDA-র একক মালিকানাধীন এবং শ্রেণী: “জঙ্গল” – সেখানে খেয়া আবাসন সমবায় সমিতি লিমিটেড বিনা বন বিভাগীয় ছাড়পত্রে একটি তিনতলা বহুতল নির্মাণ সম্পন্ন করেছে এবং প্রায় ৮০-৯০টি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুর্গাপুর বিভাগের বিভাগীয় বন আধিকারিক (DFO) তদন্তের নির্দেশ দেন। উখরা রেঞ্জের ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসার বিশ্বজিৎ মল (F.R.) ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদনে (No. 1190/UK-28) স্পষ্ট জানান, “ঘটনাস্থলে দুটি তিনতলা বহুতল নির্মিত হয়েছে। BL&LRO, Additional Durgapur-Faridpur Block-এর প্রতিবেদন (Memo No. 72/BL&LRO/Addl D-F/2024, তারিখ ১৪.০১.২০২৫) অনুযায়ী জমি অ্যাসানসোল দুর্গাপুর ডেভেলপমেন্ট অথরিটি ADDA-র মালিকানাধীন এবং শ্রেণী “জঙ্গল”। বন বিভাগ গাছ কাটার ও উন্নয়নের অনুমতি প্রদান করেনি। বন বিভাগীয় ছাড়পত্র ছাড়াই দুর্গাপুর মিউনিসিপাল কর্পোরেশন DMC এলাকায় অ্যাসানসোল দুর্গাপুর ডেভেলপমেন্ট অথরিটি ADDA-র জমিতে বহুতল নির্মাণ সংঘটিত হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে, ভবন পরিকল্পনা অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে ভাঙার প্রস্তাব পাঠানো হোক। এর পরিপ্রেক্ষিতে DFO, দুর্গাপুর বিভাগ, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে পৃথক দুটি চিঠিতে (Memo No. 4014/28-54 ও 4015/28-54) DMC কমিশনার ও ADDA-র Chief Executive Officer-কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানান, যে বন বিভাগীয় ছাড়পত্র ছাড়া এই নির্মাণ The Indian Forest (Conservation) Act, 1980 এবং সংশোধনী আইন, 2023-এর সরাসরি লঙ্ঘন, এবং যে সংস্থা বিল্ডিং প্ল্যান অনুমোদন করেছে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে এবং উত্তর দিতে বলা হয়েছিল। এতদসত্ত্বেও আজ পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি।
দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের বিধাননগরে S.P.S. Steels Rolling Mills Ltd যার বর্তমান নাম Shakambari Elegant Steel, ADDA-র রেকর্ডেড বন জমির প্রায় ২৪-২৫ বিঘা গাছ কেটে, মাটি ভরাট করে কারখানা সম্প্রসারণ করেছে বলে সুব্রত মল্লিক অভিযোগ করেন । ADDA জমির মালিক হয়েও নীরব। ADDA এর নিজের জমি কে দখল করছে, কীভাবে করছে, তা নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য নেই। বন বিভাগের চিঠি পেয়েছে, জানে দখল হয়েছে, তবু Environmental Clearance বাতিলের জন্য কোনো সুপারিশ করেনি। পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড, বন জমি দখলের পরেও ওই কারখানার EC বহাল রেখেছে। অর্থাৎ দখলদারকে পরোক্ষ বৈধতা দিয়েছে। এই তিন দফতরের একযোগে নিষ্ক্রিয়তা কি কাকতালীয়? নাকি এর পেছনে আছে স্বার্থের গভীর ষড়যন্ত্র? সুব্রত মল্লিক NGT-র পূর্বাঞ্চল বেঞ্চে App.No. 37/2025/EZ দায়ের করেছেন। মামলা চলছে — কিন্তু দখল থামেনি।
সমাজকর্মী ও আর টি আই অ্যাক্টিভিস্ট, সুব্রত মল্লিক অভিযোগ করেন, বন বিভাগ রিপোর্ট দেয়, DMC নির্মাণের অনুমতি দেয়, ADDA জমির মালিক হয়েও নীরব থাকে। RTI আবেদনের উত্তর দেওয়া হয় না। বন বিভাগের সুপারিশ অগ্রাহ্য করা হয়। আদালতে মামলা চলতে থাকে কিন্তু নির্মাণ থামে না। এই গোটা প্রক্রিয়ায় একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে বন বিভাগের NOC ছাড়া DMC কীভাবে বিল্ডিং পারমিশন দেয়? ফায়ার বিভাগই বা কোন ভিত্তিতে ছাড়পত্র দেয়? কোন স্বার্থে ADDA নিজের মালিকানাধীন বন-জমি অন্য সংস্থার দখলে চলে যেতে দেয়? এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও অন্ধকারে।
দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট বহুবার বলেছে, “জঙ্গল” লেখা জমি বন আইনের সুরক্ষার আওতায়। এই রায় জেলাশাসক জানেন, ADDA জানে, WBPCB জানে,তবু উচ্ছেদ নেই, EC বাতিল নেই, বিচার নেই। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ বছরে ২০-২৫ কেজি কার্বন শোষণ করে নিঃশব্দে। সেই গাছ কাটতে সময় লাগে মাত্র কয়েক মিনিট। কিন্তু তার শূন্যস্থান পূরণ হতে লাগে দশকের পর দশক। আর এখানে তো পূরণের কোনো ইচ্ছাই নেই। বনভূমি উজাড় হলে মাটি জল ধরতে পারে না, ভূগর্ভস্থ জলস্তর নামে, গরম বাড়ে। দুর্গাপুর-আসানসোল আজ সেই পথেই হাঁটছে। শিয়াল, বনবিড়াল, পাখি, সরীসৃপ যারা এই বনকে ঘর বলে জানত, তারা আজ আশ্রয়হীন। প্রকৃতির এই ক্ষত কোনো ক্ষতিপূরণে ভরে না। কয়েকজন শিল্পপতির মুনাফার খাতায় যোগ হচ্ছে কোটি টাকা, আর বিয়োগ হচ্ছে লক্ষ মানুষের শ্বাস নেওয়ার অধিকার। পরিবেশ দিবসে চারাগাছ লাগিয়ে ছবি তোলা যায়। কিন্তু যে ৩,২৬৮ বিঘা বনভূমি আজ দখলদারের হাতে, তার হিসাব কে দেবে? পালাবদলের পর নতুন সরকারের কাছে প্রশ্ন একটাই এই ধ্বংসযজ্ঞ কি থামবে, নাকি আগামী প্রজন্মের জন্য শুধু কংক্রিটের মরুভূমি আর বিষাক্ত বাতাস রেখে যাওয়া হবে? যে গাছ কাটা পড়ে সে আর ফেরে না। কিন্তু যে ফুসফুস পোড়ে, তার দাগ থেকে যায়।



















