সন্তোষ কুমার মণ্ডল,দুর্গাপুরঃ- দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছে প্রায় তিন শতাব্দীরও বেশি সময়। সময়ের নিয়মে অনেক কিছুই বদলেছে, কিন্তু পূর্ব বর্ধমানের বুদবুদের সোঁয়াই গ্রামের মুখার্জি বাড়ির দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য ও আবেগ আজও একই রকম অমলিন। এবছর ৩৩৪ বছরে পদার্পণ করল এই ঐতিহাসিক পুজো। আজও প্রাচীন নিয়ম ও শাক্ত মতে নিষ্ঠার সঙ্গে এখানে দেবী দুর্গার আরাধনা করা হয়।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৩৩৪ বছর আগে বাসুদেব মুখার্জির হাত ধরে এই পুজোর সূচনা হয়েছিল। বাসুদেব বাবুর আদি বাড়ি ছিল পূর্ব বর্ধমানের বাকলসার গ্রামে। সেখানে তাঁদের পারিবারিক দুর্গাপুজো হতো। পরবর্তীকালে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে তিনি বুদবুদের সোঁয়াই গ্রামের একটি টোলে (পাঠশালা) আসেন। এখানেই পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
গ্রামের নতুন জীবন শুরু করলেও নিজের বাড়ির পুজো বন্ধ করতে চাননি বাসুদেব মুখার্জি। তিনি দেবীমূর্তিকে কাঁধে করে বাকলসার গ্রাম থেকে সোঁয়াই গ্রামে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন। পথেই ঘটে এক অলৌকিক ঘটনা। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, সেই সময় বর্ধমানের মহারাজা সসৈন্যে ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। রাস্তায় দেবীকে বহনকারী দলটির মুখোমুখি হন রাজা। দুপক্ষের কেউই পথ ছাড়তে রাজি ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত স্বয়ং মহারাজা এগিয়ে এসে বিষয়টি জানতে পারেন। সব শোনার পর ভক্তিভরে দেবীকে প্রণাম করে তিনি নিজেই রাস্তা ছেড়ে দেন। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে দেবীর পুজোর খরচের জন্য বেশ কিছু জমিও দান করেন মহারাজা। সেই থেকেই সোঁয়াই গ্রামে ধুমধাম করে এই পুজোর পথচলা শুরু।
মুখার্জি বাড়িতে আজও সম্পূর্ণ শাক্ত মতে দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয়। ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় বোধনের মাধ্যমে পুজোর আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে। সপ্তমী তিথিতে দেবী বরণ, দোলা আনা, কুমারী পুজো এবং ছাগ বলির মতো আচার নিষ্ঠাভরে পালন করা হয়। অষ্টমীতেও নির্দিষ্ট রীতি মেনে ছাগ বলি হয়।
তবে এই পুজোর সবচেয়ে আলোচিত রীতি হল নবমীর মোষ বলি। নবমীর দিন মোষ বলির পাশাপাশি ভেড়া, চালকুমড়ো ও আখ বলি দেওয়ার প্রাচীন প্রথা রয়েছে। পরিবার সূত্রে জানা যায়, একসময় নবমীতে দুটি করে মোষ বলি দেওয়া হতো। কিন্তু একবার পুজোর আগের দিন একটি মোষের গলায় দড়ির ফাঁস লেগে আকস্মিক মৃত্যু হয়। তারপর থেকেই দুটি বলির পরিবর্তে একটি করে মোষ বলি দেওয়ার নিয়ম চালু হয়।
এই বলি প্রথা ঘিরে জড়িয়ে রয়েছে ব্রিটিশ আমলের এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস। ইংরেজ আমলে প্রশাসনের তরফ থেকে তত্কালীন জেলাশাসক এই বলি প্রথা বন্ধ করার কড়া নির্দেশ জারি করেছিলেন। কিন্তু লোককথা অনুযায়ী, নির্দেশ জারির পর থেকেই ওই সাহেব জেলাশাসক রাতে ঘুমাতে পারতেন না। তিনি বারবার দুঃস্বপ্ন দেখতেন যে, কেউ যেন ত্রিশূল নিয়ে তাঁকে আক্রমণ করতে আসছে। এরপর নিজের ভুল বুঝতে পেরে তিনি নিজেই বলি চালু রাখার কথা বলেন। তারপর থেকে আর কখনও এই বলি বন্ধ করার সাহস দেখায়নি কেউ।
একসময় মুখার্জি বাড়ির সদর দরজার উপরে সানাইয়ের সুরে নহবত বসত। আজ কালের নিয়মে সেই নহবতখানা ফাঁকা পড়ে থাকলেও পুজোর জৌলুস ও আন্তরিকতায় এতটুকু ভাটা পড়েনি। বর্তমানে শুধু মুখার্জি পরিবারের সদস্যরা নন, আশেপাশের বহু গ্রামের মানুষ এই পুজোয় শামিল হন। বিশেষ করে নবমীর দিনের ঐতিহ্যবাহী মোষ বলি দেখতে আজও মন্দির চত্বরে উপচে পড়ে হাজার হাজার মানুষের ভিড়। তিন শতাব্দী পেরিয়ে আজও ভক্তি ও ঐতিহ্যের এক মেলবন্ধন হয়ে টিকে রয়েছে সোঁয়াই গ্রামের এই দুর্গাপুজো।