নিজস্ব সংবাদদাতা, দুর্গাপুর:- দুর্গাপুর নগর নিগম এবং আসানসোল দুর্গাপুর উন্নয়ন পর্ষদের একাংশ পদাধিকারীর মদতে এক বেসরকারি নির্মাণ সংস্থার বিরুদ্ধে শহরের একাধিক এলাকায় বেআইনি বহুতল আবাসন খাড়া করার অভিযোগ ঘিরে শোরগোল শহরে। অভিযোগ নবপল্লী, নতুন পল্লী, ভগৎ সিং নগর থেকে শুরু করে বেনাচিতির শিকন গলি, শহরের একের পর এলাকায় গড়ে উঠেছে বেআইনি বহুতল।
নবপল্লী এলাকায় বহুতল আবাসনের জলের ট্যাঙ্কের ওপরেই নিয়ম বহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত দুটি ফ্ল্যাট বানিয়ে ফেলা হয়েছে। এর ফলে বিল্ডিংয়ের পার্কিংয়ের জায়গা অনেকটাই কমে গেছে। ডিএমসি আধিকারিকরা ইতিমধ্যেই ওই আবাসনটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে বড়সড় অসঙ্গতি খুঁজে পেয়েছেন।
নতুন পল্লীতে ওই একই নির্মাণ সংস্থার তৈরি বহুতল আবাসনে একটি বেআইনি জলের রিজার্ভার গড়ে তোলা হয়েছিল। সম্প্রতি প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে দুর্গাপুর পশ্চিমের বিজেপি বিধায়ক লক্ষণ ঘোড়ুই নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সেই বেআইনি জলের ট্যাঙ্ক ভেঙে ফেলার ব্যবস্থা করেন।
এবার ভগৎ সিং নগরে মাত্র ১০ ফুট রাস্তার ওপরেই সাত তলার বিশাল আবাসন খাড়া করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যেখানে পুরসভার আইন অনুযায়ী বহুতল নির্মাণের ক্ষেত্রে রাস্তা ন্যূনতম ৩০ ফুট চওড়া হওয়া বাধ্যতামুলক।
অভিযোগ, অভিযুক্ত নির্মাণ সংস্থার অন্যতম অংশীদার প্রদীপ মজুমদার ওরফে হাবু এক প্রাক্তন তৃণমূল নেতার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। সেই রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়েই সমস্ত নিয়মকানুনকেবুড়ো আঙুল দেখিয়ে একের পর এক বেআইনি বহুতল নির্মাণ করা হয়েছে।
এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব হয়ে দুর্গাপুর পূর্বের বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, "তৃণমূল জামানায় ইলিশ মাছ খাইয়ে আর মোটা উপঢৌকন দিয়ে ডিএমসি এবং এডিডিএ যৌথভাবে এইসব বেআইনি প্ল্যান পাস করিয়েছে। আর এখন জালিয়াতি ঢাকতে ফাইল গায়েব করে দেওয়া হয়েছে।" তিনি আরও যোগ করেন, "হাবুর মতো চুনোপুঁটিকে সামনে রেখে পেছনে যারা ব্ল্যাকমানি ঢেলেছে, সেই মূল মাথাদের টেনে বের করতে হবে।"
অন্যদিকে, দুর্গাপুর পশ্চিমের বিধায়ক লক্ষণ চন্দ্র ঘোড়ুই সুর চড়িয়ে বলেন, "টাকার বিনিময়ে দেওয়া এনওসি-র ভিত্তিতে সারা শহরে কয়েকশো বেআইনি নির্মাণ দাঁড়িয়ে রয়েছে। পুরসভার ইঞ্জিনিয়াররা তা ইতিমধ্যেই চিহ্নিত করছেন। এবার সেগুলি ভাঙার পালা।"
যদিও ফাইল গায়েব হওয়ার জল্পনা সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়েছেন ডিএমসি কমিশনার আবুল কালাম আজাদ ইসলাম। তিনি জানান, "কোনো ফাইল গায়েব হয়নি। এই সংক্রান্ত কোনো নির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ জমা পড়লে দপ্তর খতিয়ে দেখে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নেবে।"
পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারপারসন অনিন্দিতা মুখোপাধ্যায়ও সমস্ত দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "ডিএমসি-র মাধ্যমেই সম্পূর্ণ অনলাইন ব্যবস্থার নিয়ম মেনে ১৫টি ফাইল পাস হয়েছিল। এখানে কোনো দুর্নীতি হয়নি, সমস্ত ফাইল ডিএমসি-তেই সুরক্ষিত আছে।"
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগকে ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করে অভিযুক্ত ব্যবসায়ী প্রদীপ মজুমদারও বলেন, "সব প্ল্যান অনলাইনেই পাস করানো হয়েছে। ডিএমসি চাইলে যেকোনো তদন্ত করতে পারে।"
কীভাবে একের পর এক নিয়মের বিধি ভেঙে সাত তলা আবাসন বা বেআইনি রিজার্ভার তৈরি হলো, তা নিয়ে এখন তোলপাড় শিল্পশহর। ঘটনার সত্যতা উদ্ঘাটনে ডিএমসি-র পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই তাকিয়ে দুর্গাপুরের সাধারণ মানুষ।