স্টাফ রিপোর্টার, দুর্গাপুরঃ- "এসেছে শরৎ, হিসের পরশ
লেগেছে হাওয়ার পরে,
সকাল বেলায় ঘাসের আগায়
শিশিরের রেখা ধরে...........
...........যে দিকে তাকাই সোনার আলোয়
দেখি যে ছুটির ছবি-
পূজার ফুলের বনে ওঠে ওই
পূজার দিনের রবি।"
প্রতি বছরের মতো এই ২০২৬ (বাংলা ১৪৩৩ সন)-এও প্রকৃতি ধীরে ধীরে সেজে উঠেছে তার দুধ-সাদা কাশফুল ভর্তি মাঠ নিয়ে, নীল আকাশে পেঁজা তুলো মেঘের সমাহার নিয়ে, শিশির মাখা ঘাসে চরণ ছুঁয়ে যাওয়া শিউলি ফুলের আহ্বান শুনিয়ে, গন্ধ ম-ম করা ছাতিম ফুলের দল নিয়ে— বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব—'দুর্গোৎসব'-কে স্বাগতম জানাতে।"
এই উৎসব এমন এক উৎসব, এমন এক মিলনমেলা, যা চিরদিনের জন্য না হলেও এই উৎসবের ক'দিন মানুষকে ভুলিয়ে দেয় তার সকল দুঃখ, পাওয়া-না পাওয়াকে, ভুলিয়ে দেয় উঁচু-নিচু, জাত-পাতের দ্বন্দ্বকে। আর সবাইকে মাতিয়ে তোলে আনন্দ, আড্ডা আর প্যান্ডেল পরিক্রমায়। পুজো কমিটির থিমের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এখানে যেমন শিল্পীসত্তার পূর্ণ বহিঃপ্রকাশের সুযোগ ঘটে, তেমনই বাজারে বাজারে জমে ওঠে ক্রেতা-বিক্রেতার কেনাবেচার হইচই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে প্যান্ডেল ও প্রতিমা দর্শন করার এক অদ্ভুত ধৈর্য এনে দেয় এই উৎসব। বহু দিন, বহু বছর পর পুরনো বন্ধু ও প্রিয়জনদের পুনর্মিলনের অনাবিল আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি, এই দিনগুলো আমাদের উপহার দেয় স্মৃতিরোমন্থনের অজস্র মধুর মুহূর্ত।
এমনই এক স্মৃতিরোমন্থন আর নস্টালজিয়ার এক অভূতপূর্ব কোলাজ নিয়ে এবার হাজির হচ্ছে দুর্গাপুর ইস্পাত নগরীর বি-জোন-এর অত্যন্ত জনপ্রিয় "দুর্গাপুর পথিকৃৎ ক্লাব" (পূর্বে "পথিকৃৎ ক্লাব")। এস.এন. বোস, রামানুজম ও বঙ্কিমচন্দ্র সর্বজনীন দুর্গাপূজা কমিটির এই ২০২৬ সালের সুবর্ণ জয়ন্তী বর্ষের নিবেদন— একদা শিল্পনগরীর বিনোদনের প্রাণকেন্দ্র, অধুনালুপ্ত প্রেক্ষাগৃহ "চিত্রালয়"। একসময়ের কল্লোলমুখর, দর্শকঠাসা যে 'চিত্রালয়' আজ সময়ের নিয়মে অবহেলিত ও জীর্ণ হয়ে ভাঙা চোরা অবস্থায় মৃত্যুর দিন গুনছে, তাকেই মণ্ডপসজ্জার মূল ভাবনায় ফিরিয়ে আনা এক চরম সাহসিকতা ও অভিনবত্বের পরিচয়। এই ভাবনাকে একাধারে 'অভূতপূর্ব' এবং 'সময়োপযোগী' বলা চলে। অভূতপূর্ব এই কারণে, কারণ এর আগে দুর্গাপুর তথা অবিভক্ত বর্ধমান জেলার কোনো পুজো কমিটি এমন একটি রুগ্ন, বন্ধ প্রেক্ষাগৃহকে থিম করার কথা ভাবতেই পারেনি। আর সময়োপযোগী এই কারণে, কারণ আজ বিশ্বায়নের যুগে সারা দেশের পাশাপাশি বাংলাতেও এক এক করে ঐতিহ্যবাহী সিঙ্গেল স্ক্রিন সিনেমা হলগুলি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কোথাও শপিং মল হয়ে উঠছে তো কোথাও তা স্রেফ পরিত্যক্ত গুদামঘর। পথিকৃৎ ক্লাবের এই প্রয়াস স্থানীয় প্রবীণ ও নবীন প্রজন্মকে যেমন তীব্র নস্টালজিক করে তুলবে, তেমনই আপামর চলচ্চিত্রপ্রেমী মানুষের মনে এই ধুঁকতে থাকা সিঙ্গল স্ক্রিনগুলির প্রতি গভীর সমবেদনা ও ভালোবাসা জাগিয়ে তুলবে। এই থিম যেন এক নীরব প্রতিবাদ ও আর্তি— যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এই ঐতিহ্যবাহী প্রেক্ষাগৃহগুলোকে বাঁচিয়ে তোলার সদর্থক চিন্তাভাবনা করতে বাধ্য করবে।
এই প্রসঙ্গে চিত্রালয় হলটির সম্বন্ধে দু-চার কথা না বললেই নয়। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে, মূলত দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানা কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে এই প্রেক্ষাগৃহের জন্ম। লক্ষ্য ছিল কর্মচারীদের পরিবারকে বিনোদন দেওয়া। তবে ষাটের দশকের শুরুতেই এর পরিধি বাড়ে এবং সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক সিনেমা হল হিসেবে চিত্রালয় তার যাত্রা শুরু করে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, বিশাল স্ক্রিন আর উন্নত শব্দশৈলীর জন্য এই হলের কদর ছিল আকাশচুম্বী। দশকের পর দশক ধরে বাংলা, হিন্দি ও হলিউডের অজস্র ব্লকবাস্টার ছবির সাক্ষী এই প্রেক্ষাগৃহ। ১৯৭১-এর 'লাল পাথর' ও 'হাতি মেরে সাথি', '৭৫-এর কালজয়ী 'শোলে' ও 'দিওয়ার', কিংবা ২০০১-এর মেগাহিট 'গদর'—কী চলেনি এখানে! বাংলার উত্তম-সুচিত্রা জুটির 'দেয়া নেয়া' বা 'দেবী চৌধুরানী' থেকে শুরু করে প্রসেনজিতের 'গুরুদক্ষিণা'—সবই এখানে পেয়েছে তুমুল সাফল্য। এমনকি 'টাইটানিক', 'জুরাসিক পার্ক' বা 'অ্যানাকোন্ডা'-র মতো হলিউড সিনেমাও সপ্তাহের পর সপ্তাহ হাউসফুল চলেছে এই পর্দায়। কত শত গল্প জড়িয়ে আছে এই চত্বরে! টিকিটের জন্য লাইনে মারামারি, ব্ল্যাকে টিকিট কাটা, স্কুল-কলেজ ভাঙা চঞ্চলতা, কিংবা শিফট ফেরত শ্রমিকদের ক্লান্ত মুখে বিনোদনের আনন্দ। আর ছিল হলের গেটে দাঁড়ানো হল সহকারী 'গুরুদা'-র চেনা মুখটি। কিন্তু ২০০৫ সালে প্রভিডেন্ট ফান্ড সংক্রান্ত কিছু আইনি জটিলতার জেরে হঠাৎই থমকে গেল সব। আচমকাই তালা ঝুলল গেটে। বন্ধ হয়ে গেল শিল্পনগরীর বিনোদনের একটা আস্ত ইতিহাস, স্তব্ধ হয়ে গেল এক রূপালী কলতান।
আজ যে চিত্রালয় সিনেমা হল নীরব-নিথর হয়ে কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার শেষ দিন গুনছে, শিল্পনগরীর চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে মিশে থাকা সেই আবেগের আঙিনাকেই এবার মণ্ডপ সজ্জায় অস্থায়ীভাবে পুনরুজ্জীবিত করতে চলেছে দুর্গাপুর ইস্পাত নগরীর বি-জোনের 'এস.এন. বোস, রামানুজম ও বঙ্কিমচন্দ্র সর্বজনীন দুর্গাপূজা কমিটি'। মায়ের আবাহনের এই মাহেন্দ্রক্ষণে, তাঁদের সুবর্ণ জয়ন্তী বর্ষের মহতি উদ্যোগ এটি। এলাকার আবালবৃদ্ধবনিতা আজ পুজো কমিটির পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। সবার সম্মিলিত প্রয়াসে এবারের মণ্ডপ ও আলোকসজ্জা দর্শকদের শুধু মুগ্ধই করবে না, বরং তাঁদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবে চিত্রালয়ের সেই সোনালী ও রূপালী দিনগুলির নস্টালজিয়ায়।
পুজো কমিটির অন্যতম শুভাকাঙ্ক্ষী ফিরোজ আলী খানের স্মৃতিচারণায় উঠে এলো এই পুজোর আদি-কথা। ১৯৭৭ সালে পথ চলা শুরু করা তদানীন্তন 'পথিকৃৎ' এবং অধুনা 'দুর্গাপুর পথিকৃৎ ক্লাব' মূলত অ্যালয় স্টিলস প্ল্যান্টের সহায়তায় ও আনুকূল্যে গড়ে উঠেছিল। গত পাঁচ দশক ধরে শিল্পনগরীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও জনকল্যাণমুখী কর্মকাণ্ডের এক প্রধান স্তম্ভ এই ক্লাব। একসময় এখানে চ্যারিটি সিনেমা, নাটক, মেলা, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, ইনডোর-আউটডোর খেলাধুলার পাশাপাশি স্থানীয়দের জন্য লাইব্রেরি ও অবৈতনিক শিক্ষাদানের ব্যবস্থা ছিল। স্বাভাবিকভাবেই, এই ঐতিহ্যবাহী ক্লাব পরিচালিত দুর্গাপূজা বরাবরই দুর্গাপুরবাসীর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। পূর্বের সেই গরিমা ধরে রেখে, এবার সারা বাংলার বুকে নিজেদের পুজোকে এক অনন্য ও স্বতন্ত্র উচ্চতায় নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর ক্লাব কর্তৃপক্ষ। ফিরোজ বাবু ও কমিটির অন্যতম কর্মকর্তা সন্দীপ মণ্ডল জানালেন, সুবর্ণ জয়ন্তীর এই ঐতিহাসিক ক্ষণে শামিল হতে সুদূর প্রবাস থেকেও ছুটে আসছেন এই পাড়ারই কৃতি প্রাক্তনীরা। এই মাটির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে তাঁরা নানাভাবে কমিটির পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। কমিটির অন্যতম সদস্য সুদীপ চক্রবর্তী জানান, "৫০ বছরের এই শারদ আয়োজনে দর্শকদের জন্য অপেক্ষা করছে অজস্র চমক, যা ক্রমশ প্রকাশ্য।" এর পাশাপাশি, বিগত পাঁচ দশকে যেসকল কর্মকর্তা বা সদস্য পুজোকে ভালোবেসে আজ পরলোকে পাড়ি দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার্ঘ্য জানাবে কমিটি। উৎসবের দিনগুলিতে থাকছে বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—গান, আবৃত্তি, নৃত্য ও র্যাম্প ওয়াক। মহা সপ্তমীর বিশেষ আকর্ষণ—পাড়ার পুরনো বাসিন্দাদের নিয়ে এক আবেগঘন 'পুনর্মিলন সন্ধ্যা'। তবে সব ছাড়িয়ে পুজো কমিটির সবচেয়ে মহৎ ভাবনাটি হলো—অধুনালুপ্ত 'চিত্রালয়' সিনেমা হলের যেসব প্রাক্তন কর্মচারী আজও জীবিত আছেন, তাঁদের ডেকে পুজো মণ্ডপেই এক বিশেষ নাগরিক সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা।
পুজো কমিটির অন্যতম সক্রিয় সদস্যা সীমা পাত্রের কথায় উঠে এলো এক ভিন্ন ছবি। তিনি জানালেন, এই শারদ আয়োজনের নেপথ্য শক্তি হলেন পাড়ার সর্বস্তরের প্রমীলা বাহিনী। বাড়ি বাড়ি গিয়ে জনসংযোগ ও চাঁদা সংগ্রহ থেকে শুরু করে পুজোর রীতিনীতি সামলানো এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনা—সব ক্ষেত্রেই তাঁরা সমান পারদর্শী। সুবর্ণ জয়ন্তীর এই বিশেষ বছরে তাঁদের দায়িত্ব ও ব্যস্ততা স্বাভাবিকভাবেই কয়েকগুণ বর্ধিত।
বর্তমানে পথিকৃৎ ক্লাবের মাঠে এখন সাজ সাজ রব। কমিটির কর্মকর্তা ও সদস্যদের কড়া নজরদারিতে দিন-রাত এক করে মণ্ডপশিল্পীরা ফুটিয়ে তুলছেন শিল্পনগরীর সেই নস্টালজিয়াকে। দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় ঘুম ভেঙে যেন নতুন করে জেগে উঠছে একদা কল্লোলমুখর প্রেক্ষাগৃহ 'চিত্রালয়'। মণ্ডপের এই রূপায়ণে যাতে বিন্দুমাত্র খামতি না থাকে, তার জন্য সজাগ চোখ রাখছেন উদ্যোক্তারা। প্রকাশিত হচ্ছে সুবর্ণ জয়ন্তী স্মরণিকা ও উদ্বোধনের নির্ঘণ্ট। কমিটির অন্যতম প্রধান কর্মকর্তা নব ভট্টাচার্য জানান, এই ঐতিহাসিক পঞ্চাশ বছরকে ফ্রেমবন্দি করতে তাঁরা প্রকাশ করছেন একটি বিশেষ 'স্মরণিকা', যা বহু গুণীজনের স্মৃতিচারণ ও লেখায় সমৃদ্ধ। তিনি আরও জানান—আগামী ১৫ই অক্টোবর, শুভাকাঙ্ক্ষীদের উপস্থিতিতে এক শুভ সন্ধ্যায় ঠিক ৬:৩০ মিনিটে এই পুজোর গ্র্যান্ড উদ্বোধন হতে চলেছে।
দুর্গাপুর পথিকৃৎ ক্লাবের পরিচালনায় এবারের এই এস.এন. বোস, রামানুজম ও বঙ্কিমচন্দ্র সর্বজনীন দুর্গাপূজা কমিটির সুবর্ণ জয়ন্তী বর্ষের পুজোর প্যান্ডেলের থিম, বন্ধ হয়ে যাওয়া 'চিত্রালয় সিনেমা হল' যেন প্রতিটি মানুষের মনে সিঙ্গেল স্ক্রিন হলের প্রতি ভালোবাসা ও পছন্দকে পুনরায় জাগিয়ে তোলে। সারা জেলা তথা রাজ্য জুড়ে বন্ধ হয়ে থাকা এই ভগ্নপ্রায় হলগুলি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি সদর্থক কিছু ভাবতে শুরু করেন, তবেই হয়তো এমন থিম বানানোর মূল বার্তাটি সফল হবে, সার্থক হবে কমিটির এই প্রয়াস। মানুষ যেন কবির ভাষায় সুর মিলিয়ে বলে উঠতে পারে—'দাও ফিরে সেই সিঙ্গেল স্ক্রিন, লও এ মাল্টিপ্লেক্স!'"