সংবাদদাতা, পূর্ব বার্ধমানঃ- আজ কাঞ্চননগর দীননাথ দাস উচ্চ বিদ্যালয়ে বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবসে বর্ধমান সোসাইটি ফর অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ারের সহায়তায় পূর্ব বর্ধমান জেলাশাসক তথা জেলা স্বাস্থ্য দফতরের সৌজন্যে এডি এআরডি ড আনন্দ দাস এবং শিক্ষক বাসুদেব মণ্ডলের সঞ্চালনায় ও আঁখি চক্রবর্তী ম্যাডামের সক্রিয়তায় একটি শিবির আয়োজিত হয়। শিবিরের শ্লোগান ছিল : সময়মতো টিকা দিন, জলাতঙ্ক মুক্ত সমাজ গড়ুন। উপস্থিত ছিল অষ্টম নবম দশম শ্রেণি ছাত্রছাত্রীরা। সমগ্র অনুষ্ঠানটি চিত্রায়িত করেন অনিমেষ বর্মন স্যার এবং লিপিবদ্ধ করেন দীপ্ত সুন্দর মুখোপাধ্যায় স্যার I
স্বাগত ভাষণে জাতীয় শিক্ষক তথা প্রধানশিক্ষক ড সুভাষচন্দ্র দত্ত বলেন, রাজ্যসরকারের আজকের এই অনুষ্ঠান নানা বাস্তব কারণে অতি গুরুত্বপূর্ণ। পশুপাখিদের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক মেনেই এই সমাজ। এই সম্পর্ককে সুস্থ রাখতে আমাদের দরকারে ভাবনাচিন্তা করতে হয় এবং ব্যবস্থা নিতে হয়। বাদুড় ভাইরাস বহন করে, কোভিডের সময়ে প্যাঁচা বাদুড় খেয়ে অনেক ভাইরাস কমিয়ে রেখেছিল। প্যাঁচা একধরণের সোশাল ভ্যাক্সিন। এই কাঞ্চননগর এলাকায় আগে অনেক প্যাঁচা ছিল, ফলে করোনাসংক্রমণ এদিকে কম ছিল। জলাতঙ্ক একপ্রকার ভাইরাসে ছড়ায়। পথকুকুরের সমস্যা বাড়ছে। ফলে কুকুর হনুমান বিড়াল ইত্যাদি থেকে আমাদের যেমন সতর্ক থাকতে হবে, তেমন দংশন হলে বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাও নিতে হবে।
পশুচিকিৎসা বিভাগের আধিকারিক ড পবন ত্রিপাঠী বলেন, জলাতঙ্কের ভাইরাস হল একপ্রকার আরএনএ ভাইরাস। এই ভাইরাসের কবলে বিশ্বে বছরে ষাট হাজার লোক মারা যায়, ভারতে এই সংখ্যা প্রায় কুড়ি হাজার। একবার আক্রান্ত হলে মৃত্যুহার একশো শতাংশ। ফলে টিকা নেওয়া অবশ্যই দরকার। পথকুকুর থেকেই ৯০% এই রোগ হয়। স্তন্যপায়ী মেরুদণ্ডী প্রাণী থেকে বাকি ১০% হয়। বন্যপ্রাণী খ্যাঁকশিয়াল বাদুড় এরা জলাতঙ্ক ভাইরাসের বাহক। এরা নিজে আক্রান্ত হয় না, কিন্তু ছড়িয়ে দেয়। তাই জনসচেতনতা দরকার, সেই লক্ষ্যেই আজ বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠান হচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতে রাস্তার কুকুরের সংখ্যা আড়াই কোটি। কুকুর বিড়াল বানর ইত্যাদি কামড়ালে বা আঁচড়ালে রোগীর ঐ ক্ষতের জায়গা লাইফবয় সাবান মাখিয়ে একটানা ১৫ মিনিট কলের জলের তলায় রাখতে হবে – পশুটির জলাতঙ্ক থাক বা না থাক। সেক্ষেত্রে ৯০% ভাইরাস বেরিয়ে যাবে। এবং অচিরেই চালু করতে হবে জলাতঙ্ক টিকা। এটি সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়। শরীরে কোথায় কামড়াচ্ছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভাইরাস স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে গিয়ে পৌঁছায়। তাই দংশন মাথার কাছাকাছি হলে ভয় বেশি। এটি রোগীর পরিজনদের খেয়াল রাখতে হবে।
সদ্য রাষ্ট্রপতি পুরস্কার প্রাপ্ত শিক্ষক পলাশ চৌধুরী বলেন, ছাত্রছাত্রীরা! তোমরা চাইলে জলাতঙ্কের প্রাদুর্ভাব আটকাতে পারবে। স্কুল স্তর থেকে পরিবর্তনের জন্যই আজকের এই প্রয়াস। এবিষয়ে প্রাণীদের সঙ্গে ভাল ব্যবহারও জরুরি। অন্তত একটি পথকুকুরকে আমরা একজন করে দত্তক নিতে পারি। তাকে খাবার দিতে পারি। তাতে ও আমাকে রক্ষা করবে। কামড়ের মতো অনভীপ্সিত ঘটনাও কমবে।
গাছমাস্টার নামে প্রসিদ্ধ শিক্ষক অরূপকুমার চৌধুরী বলেন, কুকুর ইত্যাদি কামড়ালে বিজ্ঞানসম্মতভাবে কাজ করবে এবং অন্যকে করতে বলবে। রোগীকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে বলবে। মনে রাখবে, কুকুরের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কাজ করে। সর্বাগ্রে চাই সচেতনতা, তারপর যাতে না হয় তার ব্যবস্থা, এবং তার পরে কামড়ালে ভ্যাক্সিন। তাই কখনই কুকুরকে বিরক্ত করবে না।
এডি এআরডি সুজিত কুন্ডু স্লাইডের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের কাছে বুঝিয়ে বলেন, কুকুর বাচ্চাদের কামড়ায় বেশি। এটা মাথায় রাখতে হবে। কুকুর যখন খায় বা ঘুমায় তাকে বিরক্ত করবে না। কুকুরের বাচ্চাকে ধরতে যাবে না। কুকুরের দিকে কিছু ছুঁড়বে না। কুকুরের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকবে না। কুকুর কাছে চলে এলে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকবে, বা ধীর হয়ে যাবে। দৌড়াবে না। একান্ত কামড়াতে এলে মাথা আর মুখ বাঁচাবে।
অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার সেক্রেটারি রিনা দাঁ বলেন, প্রথম জলাতঙ্ক টিকার আবিষ্কারক লুই পাস্তুরের মৃত্যুদিনে এই জলাতঙ্ক বিরোধী দিবস পালিত হচ্ছে আজ বিশ্ব জুড়ে। এখন জলাতঙ্কের টিকা বিনামূল্যে বা অল্প মূল্যে দেওয়া হচ্ছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্ব হবে জলাতঙ্ক মুক্ত – এই লক্ষ্যপূরণে আমরা দৃঢ়সঙ্কল্প। তাই এই ধরণের শিবির আমাদের চালিয়ে যেতে হবে। ২০৩০ সালের আগে জলাতঙ্ক রোগে মৃত্যুহার শূন্য করতে হবে।
উপস্থিত ছিলেন এডি এআরডি শিবেন দেবনাথ, ওয়েলফেয়ার সোসাইটির ট্রাস্টি সদস্য শচীন্দ্রাণী ঘোষ তথা বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। ছাত্রছাত্রীদের সকলের জন্য কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে রিফ্রেশমেন্টের ব্যবস্থা করা হয় এবং সম্মানীয় ব্যক্তিবর্গকে বৃক্ষচারা উপহার দেওয়া হয়।