নিজস্ব সংবাদদাতা: একসময় পাড়ার অলিগলিতে নিয়মিত শোনা যেত ফেরিওয়ালার ডাক, “লোহা, টিন, প্লাস্টিক, ভাঙারি আছে?” বাড়িতে জমে থাকা পুরনো লোহার রড, টিনের টুকরো, প্লাস্টিক, তার কিংবা নির্মাণকাজের পর পড়ে থাকা বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে যেতেন তাঁরা। বিনিময়ে মিলত কিছু টাকা। ফলে একদিকে বাড়ির অপ্রয়োজনীয় জিনিস সরত, অন্যদিকে সেই ভাঙারি পৌঁছে যেত স্ক্র্যাপ ব্যবসা ও পুনর্ব্যবহার শিল্পে।
কিন্তু এখন বহু এলাকায় সেই চেনা ভাঙারি সংগ্রাহকদের আর দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে যেসব বাড়িতে নির্মাণকাজ চলছে, সেখানে লোহা, টিন, প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন ধরনের পরিত্যক্ত সামগ্রী জমে থাকলেও তা নিয়ে যাওয়ার লোক মিলছে না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, পুলিশের নজরদারি ও বিভিন্ন এলাকায় চুরি যাওয়া লোহা-স্ক্র্যাপ উদ্ধারের ঘটনায় ভাঙারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছোট ফেরিওয়ালাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অনেকেই নাকি এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছেন। তবে পুলিশের ভয়ে ফেরিওয়ালারা সরে গিয়েছেন, এই দাবির সরকারি নিশ্চয়তা এখনও মেলেনি।
বাড়িতে জমছে নির্মাণবর্জ্য, নির্মাণকাজ চলা বাড়িগুলিতে প্রতিদিনই কমবেশি লোহার টুকরো, বাঁকানো রড, টিন, প্লাস্টিকের পাইপ, তার এবং অন্যান্য পরিত্যক্ত সামগ্রী জমে। আগে ভাঙারি সংগ্রাহকরা বাড়ি থেকেই সেগুলি কিনে নিয়ে যেতেন। এখন সেই ব্যবস্থা অনেক জায়গায় কার্যত অচল। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই বিপুল পরিমাণ ভাঙারি যাবে কোথায়?
বাড়ির মালিকরা যদি তা সাধারণ আবর্জনার সঙ্গে ফেলে দেন, তাহলে বর্জ্যের পরিমাণ বাড়বে। রাস্তার ধারে, খালি জমিতে বা নর্দমার পাশে ফেলা হলে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি নিকাশি ব্যবস্থাতেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। শুধু বাড়ির সমস্যা নয়, প্রভাব পড়তে পারে শিল্পেও। ভাঙারি সংগ্রহের এই ছোট চক্রের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে একটি বড় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। বাড়ি থেকে সংগ্রহ করা লোহা, টিন, প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন সামগ্রী প্রথমে ছোট ভাঙারি ব্যবসায়ীর কাছে যায়। সেখান থেকে তা বৃহত্তর স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পুনর্ব্যবহারকারী ইউনিটের কাছে পৌঁছয়। শেষ পর্যন্ত এই সামগ্রী বিভিন্ন মাঝারি ও ছোট শিল্প এবং লোহা-ইস্পাত সংক্রান্ত কারখানায় কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
অর্থাৎ, বাড়ির দরজা থেকে শুরু হওয়া একটি ছোট সংগ্রহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পরিবহণ, স্ক্র্যাপ ব্যবসা, বাছাই এবং পুনর্ব্যবহার শিল্পের একাধিক স্তর। ভারতের অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থায় এমন সংগ্রাহক ও ছোট স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা বিভিন্ন গবেষণাতেও উঠে এসেছে। চুরি রুখতে ব্যবস্থা জরুরি, কিন্তু বৈধ ভাঙারি ব্যবসার পথও কি খোলা থাকবে?
লোহা বা সরকারি সম্পত্তি চুরির সঙ্গে যুক্ত স্ক্র্যাপ ব্যবসার বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অবশ্যই জরুরি। সম্প্রতি বিভিন্ন জায়গায় চুরি যাওয়া লোহা ও স্ক্র্যাপ উদ্ধারের ঘটনাও সামনে এসেছে। দুর্গাপুর আসানসোলে চুরি যাওয়া লোহার স্ক্র্যাপ উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেফতারের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, চোরাই মাল কেনাবেচা বন্ধ করতে গিয়ে বৈধভাবে বাড়ি-বাড়ি থেকে ভাঙারি সংগ্রহ করা মানুষগুলিও যদি ব্যবসা ছেড়ে দেন, তাহলে তার বিকল্প ব্যবস্থা কী?
প্রশাসনের কাছে প্রশ্ন স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, চোরাই লোহা বা সরকারি সম্পত্তি পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু বৈধভাবে বাড়ির পুরনো ভাঙারি সংগ্রহ করেন এমন ফেরিওয়ালাদের জন্য পরিচয়পত্র, নথিভুক্তিকরণ বা নির্দিষ্ট নিয়ম চালু করা যেতে পারে। তাহলে একদিকে চোরাই স্ক্র্যাপের কারবারে লাগাম দেওয়া সম্ভব হবে, অন্যদিকে বাড়ির ভাঙারি নিয়মিত সংগ্রহ এবং পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থাটিও চালু রাখা যাবে। কারণ ভাঙারি মানেই শুধুই আবর্জনা নয়। সঠিক ব্যবস্থাপনায় তার বড় অংশই আবার শিল্পের কাঁচামালে পরিণত হয়। আর সেই ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে বাড়ির উঠোন থেকে শুরু করে রাস্তা, নিকাশি এবং শেষ পর্যন্ত শিল্প, সব ক্ষেত্রেই তার প্রভাব পড়তে পারে।
এখন বড় প্রশ্ন, চোরাই স্ক্র্যাপের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বৈধ ভাঙারি সংগ্রহের জন্য প্রশাসন কি কোনও বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করবে? নাকি বাড়িতে বাড়িতে জমতেই থাকবে লোহা, টিন, প্লাস্টিক আর নির্মাণবর্জ্য?