মনোজ সিংহ, দুর্গাপুরঃ- শিল্পাঞ্চল দুর্গাপুর এখন মানুষের কাছে চিকিৎসা নগরী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। শিল্পাঞ্চল দুর্গাপুর ও তার আশেপাশের এলাকায় গড়ে উঠেছে একাধিক মেডিকেল কলেজ,মাল্টি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল,নার্সিংহোম ও বিভিন্ন রোগ নির্ণয়ের চিকিৎসালয়। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ ছুটে আসেন শিল্পাঞ্চল দূর্গাপুরে এইসব চিকিৎসালয় ও হাসপাতাল গুলিতে সু চিকিৎসার আশা নিয়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানুষকে নিরাশ হতে হয় না। কিন্তু বেশ কিছু ঘটনা আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দেয় দুর্গাপুরের চিকিৎসা জগতের অন্ধকার দিকগুলি। চিকিৎসায় গাফিলতিতে মৃত্যু ও সময় মতন উপযুক্ত চিকিৎসা না পাওয়ার ফলে প্রাণ গিয়েছে একাধিক মানুষের। তবুও এখনও শিল্পাঞ্চলের হাসপাতাল গুলিতে নিঃসন্দেহে সুচিকিৎসা হয় বলে বেশিরভাগ শিল্পাঞ্চল বাসি মনে করেন।

অন্যদিকে শিল্পাঞ্চল দুর্গাপুরের বেশিরভাগ মানুষই প্রকৃতি ও পশুপ্রেমী। শিল্পাঞ্চলের কম বেশি প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই কোন না কোন গৃহপালিত পশু,পাখি বা জীবজন্তু পোষ্য রূপে দেখা যায়। তবে শিল্পাঞ্চলের মানুষ সবথেকে বেশি বিদেশি সারমেয়/কুকুরকে পোষ্য রূপ বাড়িতে জায়গা দিয়েছেন। শিল্পাঞ্চল দুর্গাপুরে এমন অনেক পরিবার আছেন যারা তাদের নিজেদের পোষ্য সারমেয়/কুকুরকে সন্তান সমূহে ভালোবাসা ও লালন-পালন দিয়ে থাকেন। তাদের কাছে তাদের পোষ্য সারমেয়/কুকুরটি তাদের নিজের জীবনের থেকেও বেশি দামি। তাই তাদের অত্যন্ত ভালোবাসার ওই সারমেয়/কুকুরের যদি কখনো কোন ক্ষতি হয়, তাহলে তারা মানসিক ও শারীরিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েন। সেই সব মানুষদের কাছে তাদের নিজেদের সুখ স্বাচ্ছন্দের চেয়েও বেশি প্রিয় হয়ে থাকে তাদের পোষ্য সারমেয়/কুকুরটির সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপন। আর ঠিক সেই কারণেই ইদানিং কালে দুর্গাপুরে ব্যাঙের ছাতার মতন গজিয়ে উঠেছে একাধিক বেসরকারি পশু চিকিৎসালয় ও জালিয়াত চিকিৎসক। কয়েক লক্ষ টাকা দামের প্রিয় পোষ্য সারমেয়/বিদেশি কুকুরকে আধুনিক যুগের উন্নত মানের চিকিৎসার লোভ দেখিয়ে এক শ্রেণীর প্রতারক নিরন্তর শিল্পাঞ্চলের বুকে তাদের প্রতারণার জাল ছড়িয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ। এমনি এক হৃদয় বিদারক ও দুর্ভাগ্যজনক প্রতারণার শিকার হয়েছেন এক ইস্পাত নগরীর বাসিন্দা বলে লিখিত অভিযোগ দায়ার হয়েছে সিটি সেন্টার থানায় ও দুর্গাপুরের মহকুমা শাসকের দপ্তরে যথাযথ ন্যায়বিচারের আশায়।

দুর্গাপুর ইস্পাত নগরীর বি-জোনের বিদ্যাপতি রোডের বাসিন্দা মমতা হালদার তার লিখিত অভিযোগে জানিয়েছেন,গত এপ্রিল মাসে তার অত্যন্ত প্রিয় গোল্ডেন রিট্রিভার (Golden Retriver) সারমেয়/কুকুরটির অন্তরসত্তা থাকার ফলে কুকুরটির সম্ভাব্য প্রসব তারিখ ১লা এপ্রিল ছিল। কিন্তু সময় মতন তার প্রসব না হওয়ার ফলে তিনি ০৪/০৪/২৬ তারিখে ২৮ নম্বর বেঙ্গল অম্বুজা,উর্বশ্রী এলাকায় অবস্থিত 'মেট্রোপলিটন ভেটেনারি অ্যাডভান্স ক্লিনিক' (Metropolitan Veterinary Advanced Clinic) নামক এক বেসরকারি পশু চিকিৎসালয় তিনি তার অন্তঃসত্ত্বা গোল্ডেন রিট্রিভার (Golden Retriver) সারমেয়/কুকুরটিকে নিয়ে যান চিকিৎসার উদ্দেশ্যে। ওই বেসরকারি পশু চিকিৎসালয়ের পক্ষ থেকে তাকে জানানো হয় তাদের ওখানে নাকি কলকাতা থেকে পশু চিকিৎসক আসেন ও অপারেশনের মাধ্যমে তার প্রিয় সারমেয়/কুকুরটির প্রসব করানো হবে। সেই মতো অপারেশনের জন্য একটি প্যাকেজ ঠিক করেন তারা। সেটি জন্য লাগবে ৭৫০০ টাকার প্যাকেজ বলে তারা জানান। তিনি নাকি ওই বেসরকারি পশু চিকিৎসালয়ের কথায় রাজি হওয়ার ফলে দুজন প্রতিনিধি তার বাড়িতে গিয়ে অন্তরসত্তা ও সন্তান সম্ভবা গোল্ডেন রিট্রিভার (Golden Retriver) সারমেয়/কুকুরটিকে দেখে যান এবং তাদের পশু চিকিৎসালয় কুকুরটিকে নিয়ে যেতে বলেন। মমতা হালদার তার প্রিয় সন্তানসম্ভবা অন্তরসত্তা সারমেয়/কুকুরটিকে নিয়ে যাওয়ার পরেই তারা সারমেয়/কুকুরটিকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গিয়ে সিজার করা হয়। যদিও মমতা হালদার দাবি করেন তিনি জানতেনই না বা তাকে জানানো হয়নি যে অপারেশনটি কোন পশু চিকিৎসক করছেন না, করছেন একজন হাতুড়ে পশু চিকিৎসক। তিনি অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন কি করে এত বড় একটি অপারেশন একজন প্রশিক্ষিত পশু চিকিৎসক না করে, একজন হাতুড়ে পশু চিকিৎসক করল?

মমতা হালদার জানিয়েছেন অপারেশনের করে ৬টি কুকুর ছানা বের করা হয়। কিন্তু ৬টি কুকুর ছানার নাভি ঠিক মতন বাধা না হওয়ার ফলে মাত্র ৪ দিনের মধ্যেই ছয়টি কুকুর ছানায় মারা যায় এবং মা কুকুরটির অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে থাকে। এই বিষয়ে তিনি ওই বেসরকারি পশু চিকিৎসালয়ের সাথে বারংবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও বিভিন্ন অজুহাতে তারা তাকে এড়িয়ে যান বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। মমতা হালদার দাবি করেন দুর্গাপুরের এই পশু চিকিৎসালয়টি কলকাতার একটি নামি পশু চিকিৎসালয়ের (MVDR, METROPOLITAN VETERINARY DIAGNOSTICS & RESEARCH) ফ্রাইঞ্চাইছি বা অনুমোদিত শাখা। তখন আর কোন রাস্তা না পেয়ে বাধ্য হয়ে মমতা হালদার দুর্গাপুরের ওই পশু চিকিৎসালয়ের মালিক সুপ্রিত মুখার্জির বিরুদ্ধে কলকাতার মূল অফিসে অভিযোগ দায়ার করেন। ওই পশু চিকিৎসালয়ের মূল অফিসে যোগাযোগ করলে তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয় কলকাতা থেকে বিশেষজ্ঞ পশু চিকিৎসক আসবেন এবং তার প্রিয় সারমেয়/কুকুরটির সকল সমস্যা যত্ন সহকারে চিকিৎসা করা হবে। সেই মতো গত ১/৭/২৬ তারিখে যখন বিশেষজ্ঞ পশু চিকিৎসক সৌরভ কুমার তার প্রিয় সারমেয়/কুকুরটিকে পরীক্ষা করেন। তখন তিনি নাকি বুঝতে পারেন কোথাও একটা মস্ত বড় ভুল হয়ে গিয়েছে অপারেশনের সময়। বিশেষজ্ঞ পশু চিকিৎসক সৌরভ কুমার নাকি পুনরায় অপারেশন করতে হবে সারমেয়/কুকুরটির বলে ৭/৭/২৬ তারিখের ওই পশু চিকিৎসালয় কুকুরটিকে নিয়ে যেতে অনুরোধ করেন। তার সাথে তিনি সারমেয়/কুকুরটির এক্সরে ও বেশ কিছু ব্লাড টেস্ট করাতে বলেন এক সপ্তাহের মধ্যে। কিন্তু মমতা হালদার দাবি করেন ওই পশু চিকিৎসালয়ের কর্ণধার সুপ্রিত মুখার্জির খামখেয়ালী পোনার জন্য সময়মতো অপারেশনটি করা সম্ভব হয়নি। এদিকে তার প্রিয় কুকুরটির অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে থাকায় সেটি একেবারে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয়। সব সময় ঝিমিয়ে এক জায়গায় বসে থাকে। সন্তান সমূহ তার এই প্রিয় সারমেয়/কুকুরটির দুরবস্থা দেখে তিনি একজন শল্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেন। সমস্ত রিপোর্ট ও কাগজপত্র সহ এক্স-রে দেখে তিনি নাকি বুঝতে পারেন সারমেয়/কুকুরটির পেটের ভেতরে দলা পাকিয়ে এমন কিছু রয়েছে যা অপারেশনের সময় ভালো করে পরিষ্কার না করার ফলে হয়েছে। ওই চিকিৎসক সন্দেহ প্রকাশ করেন সম্ভবত প্রথমবার অপারেশন করার সময় পেটের ভেতরে নিশ্চয়ই কোন বাচ্চা রয়ে গিয়েছে। তাই তিনি পুনরায় সারমেয়/কুকুরটির অপারেশন করার জন্য সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা আবার করেন।

অবশেষে ৯/৭/২৬ তারিখে মমতা হালদারের বাড়িতেই নাকি তার প্রিয় সন্তান সমূহ সারমেয়/কুকুরটির অপারেশন করেন ওই শল্য চিকিৎসক। ওই অপারেশনের পর তিনি দেখতে পান সারমেয়/কুকুরটির পেটের ভেতরে তিন মাস চার দিন অবধি একটি ছানা/বাচ্চা মরা-গলা-পচা অবস্থায় ছিল। সেই সব কিছু ভালো করে না দেখেই নাকি প্রথমবার সৌরভ মুখার্জি নামক এক হাতুড়ে পশু চিকিৎসক 'মেট্রোপলিটন ভেটেনারি অ্যাডভান্স ক্লিনিক' (Metropolitan Veterinary Advanced Clinic) তার সারমেয়/কুকুরের অপারেশনটি শেষ ও সেলাই করে দিয়েছিলেন। এই দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজের জন্য মমতা হালদার দাবি করেন তার সন্তান সমূহ প্রিয় সারমেয়/কুকুরটি মারাও যেতে পারতো। তিনি আরও অভিযোগ করেন, সিটি সেন্টারের ওই পশু চিকিৎসালয়ের দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজের জন্য তার প্রিয় মা সারমেয়/কুকুরটি হারালো সাতটি সন্তান এবং আগামী দিনে ওই সারমেয়/কুকুরটি আর কোনদিনই মা হতে পারবেনা শুধুমাত্র হাতুড়ে পশু চিকিৎসক সৌরভ মুখার্জির (BURDWAN ANIMAL TRAINING & TREATMENT WELFARE SOCIETY, PARAVET REG.NO - 00332/2010) ও ওই বেসরকারি 'মেট্রোপলিটন ভেটেনারি অ্যাডভান্স ক্লিনিক' (Metropolitan Veterinary Advanced Clinic) পশু চিকিৎসালয়ের মালিক সুপ্রিত মুখার্জির গাফিলতি ও দায়িত্বজ্ঞানহীন চিকিৎসার জন্য।

দুর্গাপুরের মাননীয় মহকুমা শাসক ও দুর্গাপুর সিটি সেন্টার থানার আধিকারিক এর কাছে তিনি তার লিখিত অভিযোগে উক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। সাথে সাথে তিনি এই ধরনের বেসরকারি পশু চিকিৎসালয় ও হাতুড়ে পশু চিকিৎসকরা যাতে আর কোন নিরীহ জীবজন্তুকে ভুল ও দায়িত্বজ্ঞানহীন চিকিৎসায় মেরে ফেলতে না পারে ও তার মত যেন আর শিল্পাঞ্চলে কেউ এই ধরনের দুঃখজনক ঘটনার সাক্ষী না হয় সে বিষয়ে অনুরোধ জানিয়েছেন।
অন্যদিকে দুর্গাপুরের সিটি সেন্টারের ওই বেসরকারি 'মেট্রোপলিটন ভেটেনারি অ্যাডভান্স ক্লিনিক' (Metropolitan Veterinary Advanced Clinic) পশু চিকিৎসালয়ের কর্ণধার সুপ্রিত মুখার্জির সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি মমতা হালদার নামক কোন ব্যক্তিকে চেনেন না বলে জানান। তিনি সাংবাদিক এর প্রশ্নের উত্তরে জানান এখনও পর্যন্ত দুর্গাপুর মহকুমা শাসক দপ্তর ও সিটি সেন্টার থানার আধিকারিকদের কাছ থেকে তিনি কোন অভিযোগ পাননি এই সংক্রান্ত বিষয়ে। তাই তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না বলে পরিষ্কার জানিয়ে দেন।
শিল্পাঞ্চল দুর্গাপুরের পশুপ্রেমী ও সারমেয়/কুকুর প্রেমে মানুষদের মধ্যে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র চঞ্চলের সৃষ্টি হয়েছে। শিল্পাঞ্চলের একাধিক পশু পাখি প্রেমীরা অবিলম্বে নিরীহ প্রাণীদের জীবন নিয়ে খেলা করা ওইসব বেসরকারি পশু চিকিৎসালয় ও হাতুড়ে পশু চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন।