এই বাংলায় দক্ষিণ বাংলা দেশ ও বিদেশ

বিপুল ঋণ টাকা অনাদায়ী, পদত্যাগ চেয়ারম্যানের! অভিভাবকহীন 'দুর্গাপুর স্টিল পিপলস কো অপারেটিভ ব্যাঙ্ক', ঘনীভূত রহস্য

By Eaibanglai - July 30, 2026
— Advertisement —
Advertisement
বিপুল ঋণ টাকা অনাদায়ী, পদত্যাগ চেয়ারম্যানের!  অভিভাবকহীন 'দুর্গাপুর স্টিল পিপলস কো অপারেটিভ ব্যাঙ্ক', ঘনীভূত রহস্য

মনোজ সিংহ, দুর্গাপুরঃ- বিপুল অংকের অনাদায়ী ঋণ থাকা অবস্থাতেই প্রায় অভিভাবকহীন হয়ে পড়ল দুর্গাপুরের অন্যতম সমবায়  ব্যাংক 'দুর্গাপুর স্টিল পিপলস কো অপারেটিভ ব্যাঙ্ক'। ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান ললিত দাস সহ পরিচালন মন্ডলীর বেশ কয়েকজন নির্দেশক হঠাৎ করেই গত মঙ্গলবার আসানসোল স্থিত এআরসিএস দপ্তরে গিয়ে তাঁদের ইস্তফা দিয়েছেন। এই ব্যাঙ্কে বিপুল অঙ্কের বেনিয়ম হয়েছে এমনই অভিযোগ তুলে বিজেপি ও বিএমএস-এর পক্ষ থেকে ব্যাঙ্কের বর্তমান পরিচালন সমিতির উপর প্রবল চাপ দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতেই এই ইস্তফা বলে জানা গিয়েছে। পরিচালন সমিতির চেয়ারম্যান সহ অন্যান্য পদাধিকারীরা ইস্তফা দেওয়ার পর থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, তাহলে এবার এই সমবায় ব্যাঙ্কের ভবিষ্যৎ কী? এই মুহূর্তে এই সমবায় ব্যাঙ্কটির অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকা বলে প্রাথমিক এক সমীক্ষায় জানা গিয়েছে। দুর্গাপুর ইস্পাতের স্থায়ী ও ঠিকা শ্রমিক ছাড়াও দুর্গাপুর শহর ও আশপাশ এলাকার মোট ৬ হাজার ৬৭২ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এই ব্যাঙ্কের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা ঋণ নিয়ে রেখেছেন।

উল্লেখ্য, দীর্ঘ প্রায় সাত আট বছর এই ব্যাঙ্কটিতে কোন নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ায় কোন নির্বাচিত পরিচালন মন্ডলী ছিলনা দীর্ঘদিন ধরেই। ফলে এক প্রকার অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। ২০২৫ সালে তৎকালীন তৃণমূল নেতৃত্ব হঠাৎ করেই একদিন নির্বাচনের নামে প্রহসনের সৃষ্টি করে নিজেদের মধ্যেই একটি লোক দেখানো পরিচালন সমিতির জন্ম দেয়। ওই পরিচালন সমিতিতে তৃণমূল ছাড়াও আইএনটিইউসি ও অপর একটি শ্রমিক সংগঠন এইচএমএস-এর তিনজন প্রতিনিধি কে রাখা হয়। অভিযোগ উঠেছে, এই ব্যাঙ্কটিকে প্রায় পথে বসিয়ে এই শহরের আমানতকারীদের গচ্ছিত আমানত দুহাতে লুটপাট চালিয়েছে তৃণমূলেরই একটি অংশ। এ প্রসঙ্গে আইএনটিইউসি নেতা ও এই পরিচালন কমিটির অন্যতম নির্দেশক রজত দীক্ষিত বলেন, "রাজ্যে গত চৌঠা মে পরিবর্তনের পর হঠাৎ করেই এই ব্যাংকের পরিচালন সমিতি থেকে ইস্তফা দেন আইএনটিটিইউসি নেতা মানস অধিকারী এবং বাপ্পা চট্টরাজ। ওই দুই ব্যক্তি ইস্তফা দিলেও পরিচালন সমিতির চেয়ারম্যান ললিত দাস ও ভাইস চেয়ারপারসন শ্রাবণী সরকার এতদিন পর্যন্ত স্বপদে বহালই ছিলেন। হঠাৎ করেই চেয়ারম্যান ললিত দাস ইস্তফা দেওয়ায় প্রশ্ন উঠছে, তাহলে এই অনাদায়ী ঋণের দায়িত্ব এখন কে নেবে?" শুধু বিপুল ঋণ টাকা অনাদায়ী  নয়, এমন অনেক ঋণ গ্রহীতা রয়েছে যরা কিনা যে ঠিকানায় ব্যবসা দেখিয়ে ঋণ নিয়েছিলেন উপস্থিতে তাদের সেখানে গিয়ে কোন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে বিভিন্ন সূত্রে অভিযোগ রয়েছে ।  

স্মরণে থাকতে পারে বাম আমলে তৎকালীন সিপিএমের এক প্রথম সারির নেতার প্রত্যক্ষ মদতে দুর্গাপুরের এক হোটেল ব্যবসায়ী এই সমবায় ব্যাঙ্ক থেকে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আর সে টাকা পরিশোধ করেননি। সেসময় বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট জল ঘোলা হলেও কোন এক অজ্ঞাত কারণে পুরো বিষয়টিই ধামাচাপা পড়ে যায়। পরবর্তীকালে ওই হোটেল ব্যবসায়ী তাঁর ব্যবসার আরও নানা ক্ষেত্রে বিস্তার ঘটিয়েছেন। কিন্তু দুর্গাপুর স্টিল পিপলস কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কের সেই ঋণ তিনি পরিশোধ করেননি। এরপরই রাজ্যে পরিবর্তন ঘটে। ক্ষমতায় আসে তৃণমূল। এবং ওই হোটেল ব্যবসায়ীও শিবির বদলে সুকৌশলে শাসক দলের ঘনিষ্ট হয়ে যান। এমনকি কালক্রমে পূর্বতন  মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত স্নেহভাজনও হয়ে ওঠেন ওই হোটেল ব্যবসায়ী। এছাড়াও এই সমবায় ব্যাঙ্কটি থেকে তৃণমূলের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থাকা বেশ কয়েকজন ওজনদার ব্যবসায়ী কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আর পরিশোধ করেননি। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তাঁরা পিপুল অঙ্কের টাকা এই ব্যাংক থেকে ঋণ পেলেও ঋণ পরিশোধ করার প্রয়োজনই বোধ করেননি কেউই। এ বিষয়ে ব্যাঙ্কেরই অন্দরমহল থেকে অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে, এই ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে বিশাল অঙ্কের কাট মানির খেলা হয়েছে। এবং এই কাট মানি সংক্রান্ত বেশ কিছু অভিযোগ শহর জুড়ে ঘুরপাক খাওয়ার মধ্যেই রহস্যজনকভাবে অস্বাভাবিক মৃত্যু হয় এই ব্যাঙ্কেরই পূর্বতন চেয়ারম্যান বিশিষ্ট তৃণমূল নেতা নিখিল নায়েকের!

নিখিল নায়েক বাবুর ওই রহস্য মৃত্যুর পরেই তৎকালীন তৃণমূলের জেলা সভাপতি ও পাণ্ডবেশ্বরের বিধায়ক নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী সরাসরি দাবি করেছিলেন, নিখিল বাবুকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে। এমনকি ওই একই দাবিতে সরব হতে দেখা যায় দুর্গাপুর পূর্বের বিধায়ক ও রাজ্যের মন্ত্রী প্রদীপ মজুমদারকেও। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, নিখিল বাবুর ওই রহস্য মৃত্যুকে সাধারণ মামুলি একটি 'আত্মহত্যার' ঘটনা বলে পুরো তদন্ত প্রক্রিয়াতেই জল ঢেলে দেওয়া হয় পুলিশের পক্ষ থেকে। নিখিল নায়েকের রহস্য মৃত্যুর ঘটনা ঠান্ডা ঘরে চলে যাওয়ার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, এই সমবায় ব্যাঙ্কের বর্তমান যারা পরিচালন কমিটিতে ছিলেন তাঁদের ভূমিকা নিয়েও। 

বর্তমানে এই ব্যাঙ্কের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৫১০০০। তাঁদের সকলের গচ্ছিত আমানত থেকেই কোটি কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছিল ঋণ গ্রহীতাদের। একটি স্থুল হিসেবে দেখা যাচ্ছে, এই মুহূর্তে ৬৬৭২টি লোন অ্যাকাউন্ট প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকার মতো ঋণ প্রদান করা হয়েছে ঋণ গ্রহীতাদের। এ প্রসঙ্গে আইএনটিইউসি নেতা রজত দীক্ষিতের স্পষ্ট দাবি, "যতক্ষণ না পর্যন্ত ব্যাঙ্কের  অডিট প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি এবং অপর আইএনটিইউসি নেতা পরেশ কর্মকার ওই পরিচালন সমিতির ডাইরেক্টর পদ থেকে ইস্তফা দেবেন না। কারণ এক্ষেত্রে ইস্তফা দেওয়ার অর্থই হল, দায়িত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে পালিয়ে যাওয়া। যাঁরা কাটমানির বিনিময়ে কোটি কোটি টাকা ঋণ দিয়েছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে, সেই টাকা আদায়ের পাশাপাশি স্বচ্ছ ও নির্ভুল অডিটের মাধ্যমে জনগণের এই অর্থের পুরো তালিকা জনসমক্ষে  নিয়ে আসতে হবে বলে দাবি তোলেন রজত বাবু। তৃণমূলের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থাকা যেসব ওজনদার ব্যবসায়ী এই ব্যাঙ্ক থেকে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন, তাদের প্রত্যেকের নাম সংবাদ মাধ্যমেও প্রকাশ করতে হবে।"

দুর্গাপুর স্টিল পিপলস কোঅপারেটিভ ব্যাঙ্কের এই জালিয়াতিকে অনেকেই নীরব মোদী, মেহুল চোকশি, ললিত মোদী, বিজয় মালিয়া সহ অন্যান্য ব্যবসাদারদের মেগা জালিয়াতির ক্ষুদ্র সংস্করণ বলে দাবি করেছেন। অবিলম্বে এই ব্যাঙ্কের দায়িত্বে থাকা প্রত্যেকের বিরুদ্ধে তদন্তের পাশাপাশি প্রায় অনাদায়ী হয়ে যাওয়া ওই ঋণের টাকা ব্যাঙ্কে ফিরিয়ে আনার দাবি তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে নিখিল নায়েকের রহস্য মৃত্যুর ফাইল নতুন করে খোলারও দাবি তোলা হয়েছে বিভিন্ন মহল থেকে। তৃণমূলের পশ্চিম বর্ধমান জেলা সভাপতি নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী  নিখিল বাবুর মৃত দেহ দেখেই দাবি করেছিলেন, আত্মহত্যা নয়, খুনই করা হয়েছে নিখিল বাবুকে। সে ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি সেই মৃত্যু রহস্য ধামাচাপাই বা কেন দেওয়া হল উঠেছে সেই প্রশ্নও। কাকে বাঁচাতে সেদিন সেই রহস্য মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে দাগিয়ে দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলেছিল পুলিশ? সেই রহস্য মৃত্যুর ঘটনাটিকেও নতুন করে তদন্তের আতস কাঁচের নিয়ে আসার দাবি তুলেছেন শিল্পাঞ্চলের বাসিন্দারা। প্রশ্ন উঠছে, বিজেপি কি সত্যিই সেই রহস্যের জট খোলার ব্যাপারে আদৌ কোন পদক্ষেপ করবে? এই যাবতীয় প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছেন শিল্পাঞ্চলের মানুষ। 
 

— Advertisement —
Advertisement
— Advertisement —
Advertisement
— Advertisement —
Advertisement
— Advertisement —
Advertisement
— Advertisement —
Advertisement
— Advertisement —
Advertisement
— Advertisement —
Advertisement
— Advertisement —
Advertisement