মনোজ সিংহ দুর্গাপুর :- ঠেলায় পড়ে সেই বাঘ কবি সত্যিই কি বিড়াল হয়ে এবার গাছে উঠে পড়ল? দুর্গাপুর পশ্চিমের বিধায়ক লক্ষণ ঘোড়ুই মঙ্গলবার দাবি করেছেন,”ঠেলায় না পড়লে বিড়াল কি গাছে ওঠে? সবদিক থেকে এবার দারুণ চাপে পড়ে তবেই কবি দত্ত নিজের হোটেলের অবৈধ নির্মাণ নিজেই ভাঙতে শুরু করেছেন।”

এবারের বিধানসভা ভোটে দুর্গাপুর পশ্চিম কেন্দ্রের তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী কবি দত্ত যিনি কিনা আসানসোল দুর্গাপুর উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যানও ছিলেন এখন নিজের বেআইনি নির্মাণে ভরা হোটেল রাতের অন্ধকারে নিজেই ভাঙতে শুরু করেছেন বলে শহরে জল্পনা তুঙ্গে। মঙ্গলবার সকাল সকাল যা দেখে হতবাক শহরবাসী। ছড়াল ব্যাপক চাঞ্চল্যও। পথচলতি বহু মানুষ এইদিন তারিয়ে তারিয়ে দেখলেন কেমন করে নিজেই নিজের হোটেল ভেঙে চুরমার করছেন এক কালের দোরদণ্ড প্রতাপ কবি দত্ত। যদিও,তার সেই সিটি সেণ্টারের সিটি রেসিডেন্সি হোটেলেটির পদস্থ কর্তৃপক্ষের দাবি, এটি শুধুমাত্র সংস্কারের কাজ এবং কাজ শেষ হওয়ার পর রেস্তোঁরা আগের জায়গাতেই ফের চালু করা হবে। এই ভাঙচুর নাকি করা হচ্ছে পুনর্নবিকরনের জন্য।

কিন্ত, দুর্গাপুরের দুই বিধায়ক এইদিন বারে বারে জোরদার দাবি করেন, সরকারের তরফ থেকে ভাঙচুর চালানোর আগে ভয়ে নিজেই নিজের হোটেলের অবৈধ নির্মাণ ভাঙার কাজ শুরু করেছেন কবি। দুর্গাপুর পূর্বের বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি,”কবির সব জবরদখল আর তার উপর বেআইনি নির্মাণ দরকার হলে পাতাল থেকেও বের করে আনবো কবিকে। কেউ রুখতে পারবেনা।”

উল্লেখ্য, তৃণমূল কংগ্রেস সরকার থাকাকালীন এই কবি দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন জমি ও সরকারি জায়গার উপরে একাধিক ব্যবসা ফেঁদে বসেছিলেন বলে অভিযোগ। সরকারি ক্ষমতার বলে বলিয়ন হয়ে দুর্গাপুরের প্রাণকেন্দ্র সিটি সেন্টারে সিটি রেসিডেন্সি নামক এক হোটেল নির্মাণ করেন, অবৈধ বিল্ডিং তৈরী করেন, যা নিয়ে বহুবার অভিযোগ উঠেছিল। কিন্ত প্রভাব বিস্তার করে সে সবই ধামাচাপা দিয়ে দেন নাকি কবি।
তৃণমূল কংগ্রেসের তৎকালীন দুর্গাপুর নগর নিগমের মেয়র দিলীপ আগস্তি বহুবার চিঠি দিয়ে তার ওই হোটেলের অবৈধ নির্মাণ গুলি ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সাথে সাথে তিনি প্রায় ৮০ লক্ষ টাকার কাছাকাছি জরিমানাও করেছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু অভিযোগ, তখন কবি দত্তের ক্ষমতা এতটাই বেশি ছিল যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও মন্ত্রী ফিরাদ হাকিমের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত দুর্গাপুরের অত্যন্ত দক্ষ ও সৎ মানুষ হিসেবে পরিচিত তৎকালীন মেয়র দিলীপ আগস্তিকে ইস্তফা দিতে বাধ্য করা হয় বা দেন। তারপর থেকেই নাকি কবি দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের একাধিক সরকারি জায়গা খুব সহজেই নিজের ক্ষমতা বলে বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে শুরু করেন বলে অভিযোগ। কোথাও হোটেল, কোথাও রেস্তোরা, কোথাও হসপিটাল, আবার কোথাও বিশাল আবাসন প্রকল্পের জন্য যথেচ্ছ সরকারি জমি হস্তান্তর করেন কবি দত্ত নিজের ক্ষমতায় বলে অভিযোগ।
দুর্গাপুর পূর্বের বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় এদিন জানিয়েছেন,”নিজের সব কৃতকর্ম চাপা দিয়ে পিঠ বাঁচতে কবি এখন উপরতলার অনেককে ফোন করছেন। কোন লাভ হবে না।”
গত ৪(চৌঠা) মে বিকেলে যখন গোটা পশ্চিমবঙ্গের চিত্র পরিষ্কার হয়ে যায় যে রাজ্যে এবার ক্ষমতায় আসতে চলেছে ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন সরকার। তখনই দুর্গাপুর সরকারি মহাবিদ্যালয় ভোট গণনা কেন্দ্র থেকে বেরোনোর সময় কবি দত্ত ও তার সঙ্গীদেরকে ‘চোর চোর’ বলে তাড়া করেন সাধারণ মানুষ। সেই থেকেই আর জনসমক্ষে কবিকে দেখা যাচ্ছিল না। সরকার গঠন হওয়ার পরেই কড়া ভাষায় দুর্গাপুর নগর নিগম কর্তৃপক্ষ কবি দত্তর তৈরি ওই হোটেল সিটি রেসিডেন্সিকে আবার তার অবৈধ রূপে নির্মাণ করা হোটেলের অংশটি ভেঙে ফেলার আদেশ জারি করেন বলে সূত্র মারফত জানা যায়। তখন থেকেই রাতের অন্ধকারে প্রথমে সিটি রেসিডেন্সি হোটেলের ভেতরে থাকা একটি সুইমিংপুলকে রাতারাতি মাটি দিয়ে ভরাট করে দেওয়া হয়,বলে জানা গেছে। তারপরেই গতকাল রাত থেকে সিটি রেসিডেন্সি হোটেলের অবৈধ নির্মাণ গুলি নিজেই ভাঙতে শুরু করেছেন কবি দত্ত বলে জানা গেছে।
https://www.facebook.com/share/p/1G8nAZRVRS
যদিও স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক লক্ষণ ঘোড়ুই বলেছেন যেখানেই কোন অবৈধ নির্মাণ হবে সেখানেই চলবে বুলডোজার। কিন্তু বুলডোজার অ্যাকশনে আসার আগেই সিটি রেসিডেন্সির ব্র্যান্ডেড রেস্টুরেন্ট ‘দি ঠেক’ নাকি ভেঙে গুঁড়িয়ে ফেললেন নিজেই কবি দত্ত রাত্রের অন্ধকারে। এই খবর জানাজানি হতেই স্থানীয় বিজেপি কর্মী সমর্থকদের মধ্যে উল্লাস লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু অনেক নেতাকর্মীদের কে আক্ষেপের সুরে বলতে শোনা গেছে,”বুলডোজার দিয়ে পুরো হোটেলটাই ভেঙে ফেলতে হবে। ওই সিটি রেসিডেন্সি হোটেলটির অবস্থা এখন এক কম্বলের মতো। যতই লোম তুলুন ততই উঠবে। ফলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নগর নিগম কর্তৃপক্ষের উচিত সম্পূর্ণভাবে হোটেল সিটি রেসিডেন্সিকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।”
অন্যদিকে তারই অন্যতম সহযোগী দুর্গাপুরের এক ব্র্যান্ডেড স্বর্ণ ব্যবসায়ী তিনিও অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন রাষ্ট্রায়ত্ত্ব তেল কোম্পানির বেশ কিছুটা জায়গা। সাধারণ বিজেপি কর্মী সমর্থকদের অভিযোগ অবিলম্বে ওই স্বর্ণ ব্যবসায়ীর দখলে থাকা জায়গা অবিলম্বে উন্মুক্ত করে দিতে হবে সাধারণ জনগণের জন্য।
ঘটনার প্রসঙ্গে বিজেপি বিধায়ক লক্ষণ ঘোড়ুই বলেছেন, “জেলাশাসক এডিডিএ সভাঘরে বৈঠক করেন জবরদখল আর বেআইনি নির্মাণ নিয়েও কথা ওঠে। সেখানে পরিস্কার বলেছি কবি দত্তর সিটি সেণ্টারের, বিধাননগরের হোটেল, হাসপাতাল, আর ৫৪(চুয়ান্ন) ফুটের ফ্ল্যাট সব কিছুই তদন্তে আনতে হবে। সে যে হরিদাস পালই হোক অবৈধ নির্মাণ ভাঙাতে হবে।” গত শনিবারই কবির যাবতীয় সম্পত্তির হদিস পেতে তোড়জোড় শুরু হয় এডিডিএ তে বলে জানা গেছে।
দুর্গাপুর পূর্বের বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন,”মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আসলে দুটো ভাইপো ছিল। কলকাতায় একটা আর এখানে আরেকটা। মমতার ক্ষমতা আর ভয় দেখিয়ে এখানে যা ইচ্ছা তাই করছে কবি। ওকে ছাড়ার কোন প্রশ্নই নেই।” এই পরিস্থিতিতে নতুন করে বিতর্ক উস্কে দিয়েছেন বিজেপি বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, “রেস্তোঁরা সরকারি জমি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছিল। সেই কারণেই মালিকপক্ষ এখন নিজে থেকেই ওই অংশ সরিয়ে নিচ্ছেন। মালিক নিজে থেকে সরিয়ে নিচ্ছেন, এটা ভাল কথা। তবে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির বহু অভিযোগ রয়েছে। সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখে তদন্ত হবে।”



















