মনোজ সিংহ, দুর্গাপুর:- দীর্ঘ ৩ দশকের বাম শাসনের পতন ঘটিয়ে ২০১১ সালে রাজ্যের ক্ষমতা দখল করে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যের অষ্টম মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাম আমল থেকে চিটফান্ড ব্যবসার রমরমা কে কড়া হাতে দমন করার লক্ষ্যে ২০১৩ সালে জম্বু কাশ্মীরের রাজ্যের শোনমার্গ থেকে গ্রেফতার করা হয় সারদা চিটফান্ড গোষ্ঠীর কর্ণধার সুদীপ্ত সেন কে। এই গ্রেপ্তারির পরেই গোটা রাজ্যজুড়ে একাধিক বেআইনি অর্থলোগ্নীর সংস্থার হদিশ মেলে। রাজ্যজুড়ে চলে ধরপাকড় ও গ্রেফতারীর পর্ব। সেই সময় উঠে আসে রোজ ভ্যালি নামক এক চিটফান্ড সংস্থার নাম। পরে দীর্ঘ আইনি জটিলতার পর হাইকোর্টের নির্দেশে ওইসব বেআইনি চিটফান্ড কোম্পানির সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। ওই সব বেআইনি অর্থ লগ্নী সংস্থায় টাকা রেখে সর্বস্ব হারিয়ে ছিলেন রাজ্যের গরীব মানুষ।
একটি সূত্র মারফত জানা যায়, রোজ ভ্যালি নামক ওই চিটফান্ড কোম্পানির দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা প্রায় ২৩ টি হোটেল বাজেয়াপ্ত করা হয়। কলকাতা হাইকোর্টের আদেশ অনুযায়ী দুটি কমিটি তৈরি করে চিটফান্ড কেলেঙ্কারিতে সর্বস্বান্ত হওয়া আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও চিটফান্ড কেলেঙ্কারির অন্যতম সংস্থা রোজ ভ্যালি কোম্পানির কতটা সম্পত্তি বিক্রি করে আমানতকারীদের ফেরত দেওয়া হয়েছে জানতে চায় কলকাতা হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ। রোজ ভ্যালির বাজেয়াপ্ত হওয়া সম্পত্তি হাইকোর্টের নির্দেশের পরেও বিক্রি না করে তা নিয়ে ব্যবসা চালানোর মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি হাইকোর্টের নজরে এনেছেন রোজ ভ্যালিতে সর্বস্বান্ত হওয়া আমানতকারী ও প্রতারিতরা। রোজ ভ্যালির ২৩টির মধ্যে অন্তত ১৮টি হোটেল দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রমরমিয়ে চলছে বলে অভিযোগ। সেই সব হোটেল চালিয়ে প্রতি মাসে যে টাকা উঠছে তার সিংহভাগ যাচ্ছে কিনা রোজ ভ্যালিরই শাখা সংস্থায়!
অথচ গত এক দশকে একাধিক বার কলকাতা হাইকোর্ট স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে বাজার থেকে তোলা টাকায় যে সব সম্পত্তি তৈরি হয়েছে, সে সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা বিক্রির পর সেই টাকা প্রতারিতদের হাতে ফেরাতে হবে। তা হলে রোজ ভ্যালি নিয়ে এত বড় অনিয়ম চলল কী করে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২০১৫ সালেই রোজ ভ্যালিতে ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা ফেরাতে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি দিলীপ শেঠের নেতৃত্বে কমিটি গড়ে দিয়েছিল বিচারপতি অরিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চ। ওই সংস্থার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও বিক্রি করে ক্ষতিপূরণ মেটানোর কথা ছিল। শেঠ কমিটিতে ইডি ও রাজ্যের আর্থিক দুর্নীতি দমন শাখার দুই পদাধিকারীও রয়েছেন।
রোজ ভ্যালির হোটেল–সহ যাবতীয় সম্পত্তিও শেঠ কমিটিরই হাতে রয়েছে। তার পরেও কী করে বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি নিয়ে ব্যবসা চলে,তা জেনে তাজ্জব হাইকোর্টও। এই অবস্থায় বেআইনি অর্থলগ্নি সংস্থা নিয়ে শুনানির ভারপ্রাপ্ত বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বিশেষ বেঞ্চ গত ২১ নভেম্বর ২০২৪ নির্দেশ দিয়েছিলেন, রোজ ভ্যালির দু’টি শাখা সংস্থা এতদিন ধরে যে ব্যবসা করেছে, তার যাবতীয় হিসেব পেশ করতে হবে হাইকোর্টে। ওই সব সম্পত্তি বা বেআইনি কোম্পানির কোনও ভাবেই পুনরুজ্জীবন ঘটানো যাবে না।
উল্লেখ্য কলকাতা হাইকোর্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত শেঠ কমিটির এক নির্দেশিকা থেকে জানা গেছে, ‘চকলেট হোটেল প্রাইভেট লিমিটেড’ নামক এক সংস্থাকে নাকি রোজ ভ্যালি কোম্পানির বাজেয়াপ্ত হওয়া হোটেলগুলি চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যদিও আমানতকারীদের একাংশের অভিযোগ রোজভ্যালি সংস্থার অন্যতম সহযোগী সংস্থা এই ‘চকলেট হোটেল প্রাইভেট লিমিটেড’ যা কিনা আগে থেকেই রোজভ্যালির শাখা হিসেবে কাজ করছিল। এই কাজের জন্যে দু’জন ব্যক্তির সঙ্গে চুক্তিও হয়। আমানতকারীদের অভিযোগ, সব হোটেল মিলিয়ে মাসে প্রায় আড়াই কোটি টাকা আয় হলেও তার সিংহভাগ চলে যায় রোজ ভ্যালির ওই শাখা সংস্থাতেই। আর কিছু টাকা যায় ইডি–র তহবিলে। কমিটি এ সবের কোনও হিসেব নাকি দেয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে হাইকোর্টে। আবার এরই মধ্যে দুর্গাপুরের প্রাণকেন্দ্র সিটি সেন্টারের জংশন মল সংলগ্ন একটি বিলাসবহুল হোটেল “পার্ক প্রাইম ” মালকিন মিতা মাহাতোকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত লিজে দেওয়া থাকলেও মাঝ পথে লিজ বাতিল করার মতো অনিয়মের অভিযোগে নতুন মামলাও হয়েছে কলকাতা হাইকোর্টে।
গত ১১ মে ২০২৬ সন্ধ্যায় দুর্গাপুরের প্রাণকেন্দ্র সিটি সেন্টারের জংশন মল সংলগ্ন একটি বিলাসবহুল হোটেলে আচমকাই গন্ডগোল বাঁধে। ‘পার্ক প্রাইম’ নামক ওই হোটেলে নাকি এক মহিলা দলবল নিয়ে গিয়ে হোটেল দখল করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ ওই হোটেলের কর্মীদের। ঘটনাকে ঘিরে সেইদিন ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়ায় এলাকায়। স্থানীয় একটি সূত্র মারফত খবর, “পার্ক প্রাইম ” হোটেলের প্রাক্তন মালকিন মিতা মাহাতো নাকি এদিন সন্ধ্যায় বেশ কয়েকজন যুবককে সঙ্গে নিয়ে হঠাতই হোটেলে প্রবেশ করেন এবং ওই হোটেলের সমস্ত কর্মচারীদের হোটেল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি দেন। সাথে সাথে তিনি এও দাবি করেন যে অন্যায় ভাবে তার দায়িত্বে থাকা এই হোটেলের পরিচালন ক্ষমতা স্থানীয় শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা ও হোটেল ব্যবসায়ী কবি দত্ত নাকি তার প্রাক্তন ম্যানেজারকে দিয়ে ২ বছর আগে দখল করে নিয়েছেন অবৈধভাবে। তিনি আরও অভিযোগ করেন বেশ কিছুদিন আগে যখন নাকি হোটেল পরিচালনার দায়িত্বে তিনি ছিলেন তখন, তার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে হোটেল ব্যবসায়ী কবি দত্ত এখানে একটি ‘রেড পার্টি’ পরিচালনা করে এবং পুলিশ দিয়ে মিথ্যা কেসে তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেন। হোটেল ব্যবসায়ী যেহেতু রাজ্যের প্রাক্তন শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের ঘনিষ্ঠ নেতা ছিলেন তাই এতদিন তিনি তার হোটেলের দখল নিতে পারছিলেন না। তাই রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর তিনি তার ন্যায্য দাবি জানিয়ে ওই হোটেলটি দখল নিতে আসেন।
অন্যদিকে ঘটনার খবর পেয়ে স্থানীয় দুর্গাপুর থানার পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানেরা দ্রুততার সাথে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় ও পরিস্থিতি সামাল দেয়। ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এদিকে পুলিশি হস্তক্ষেপের পরেই তড়িঘড়ি ‘চকলেট প্রাইভেট লিমিটেডের’ অধীনে চলা পার্ক প্রাইম হোটেলের জেনারেল ম্যানেজার তুহিন শুভ্র পাল এক সাংবাদিক সম্মেলন করে জানানোর চেষ্টা করেন যে এই হোটেলের প্রাক্তন লিজ হোল্ডার মিতা মাহাতো নাকি বলপূর্বক হোটেল দখল করতে এসেছিলেন। অন্যদিকে একই দিনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে পার্ক প্রাইম হোটেলের লিজ হোল্ডার বলে দাবি করা মিতা মাহাতো জানান অবৈধভাবে তাকে লিজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এই সমস্ত ঘটনার পেছনে দুর্গাপুরের অন্যতম তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা ও হোটেল ব্যবসায়ী কবি দত্ত ও তার হোটেলের প্রাক্তন জেনারেল ম্যানেজার তুহিন শুভ্র পাল এর সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। তিনি ইতিমধ্যেই কলকাতা হাইকোর্টে এ বিষয়ে একটি মামলাও রুজু করেছেন। আসানসোল দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের অন্তর্গত দুর্গাপুর থানার পুলিশ ইতিমধ্যেই একটি অভিযোগ নথিভূক্ত করেছেন ও তদন্ত শুরু করেছেন বলে জানা গেছে।


















